নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর শানে ‘রহমতে আলম’ ও ‘নূরে মুজাসসাম’ শব্দ দ্বয়ের ব্যবহারের বিধান

প্রশ্ন: ‘রহমতে আলম’ ও ‘নূরে মুজাসসাম’ এ দুটো শব্দের অর্থ কি? একটি গজলে এই দুইটি শব্দ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ক্ষেত্রে ব্যবহার করলে এর কী অর্থ দাঁড়ায়? বা এ দুটি শব্দ তাঁর শানে ব্যবহার করা সঠিক কি না?
উত্তর:
নিম্নে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর শানে ‘রহমতে আলম’ ও ‘নূরে মুজাসসাম’ শব্দদ্বয়ের ব্যবহার প্রসঙ্গে সংক্ষিপ্তভাবে আলোকপাত করা হল।
وبالله التوفيق
❑ আল্লাহর নবী ‘রহমতে আলম’ (সৃষ্টিকুলের জন্য রহমত বা দয়া):
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘রহমতে আলম’ অর্থাৎ বিশ্ববাসীর জন্য আল্লাহর রহমত। এটি কুরআন ও সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَمَآ أَرۡسَلۡنَٰكَ إِلَّا رَحۡمَةٗ لِّلۡعَٰلَمِينَ
“আর আমি তো আপনাকে সৃষ্টিকুলের জন্য শুধু রহমত (দয়া) রূপেই প্রেরণ করেছি।” [সূরা আম্বিয়া: ১০৭]
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
يَا أَيُّهَا النَّاسُ، إِنَّمَا أَنَا رَحْمَةٌ مُهْدَاةٌ
“হে মানব মণ্ডলী, নিশ্চয় আমি রহমতের উপহার হিসেবে প্রেরিত।” [তাখরিজুল মিশকাতিল মাসাবিহ, হা/৫৭৩৭, সহিহুল জামে, হা/২৩৪৫-আলবানি]
❑ ‘নূরে মুজাসসাম’ একটি বিদআতি শব্দ:
‘নূরে মুজাসসাম’ অর্থ: নূরের দেহ সত্তা বা এমন দেহ যা নূর দ্বারা তৈরি। এটি একটি বিদআতি ও বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী শব্দ যা কুরআন ও হাদিসে কোথাও উল্লেখিত হয় নি বা কোনও সাহাবি-তাবেঈ তাঁকে উদ্দেশ্য করে এ শব্দটি ব্যবহার করেছেন বলে প্রমাণ নেই।
সুফি বেদাতিরা প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর শানে এই শব্দটি ব্যবহার করে থাকে। কারণ তারা বিশ্বাস করে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নূরের সৃষ্টি বা তাঁর দেহাবয়ব নূর দ্বারা গঠিত। (যেমন: ফেরেশতারা নুরের সৃষ্টি) কিন্তু এটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি বাড়াবাড়ি, মিথ্যাচার এবং বেদাতি কথা।
❑ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন আলোকিত শ্রেষ্ঠ মহামানব:
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একজন আদম সন্তান। আরবের শ্রেষ্ঠ বংশ কুরায়শ বংশে জন্মগ্রহণকারী একজন মানুষ। আর আদম মাটি থেকে সৃষ্টি। সুতরাং আদি পিতা আদম আ. এর অন্যান্য সন্তানগণ যে উপাদান থেকে সৃষ্টি তিনিও সে একই উপাদান থেকে সৃষ্টি। কিন্তু মহান আল্লাহ তাঁকে নবুওয়ত ও রিসালাতের মর্যাদা প্রদানের মাধ্যমে সমগ্র সৃষ্টিলোকের উপরে সর্বোচ্চ শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যদা দান করেছেন।
মহান আল্লাহ বলেন,
قُلۡ إِنَّمَآ أَنَا۠ بَشَرٞ مِّثۡلُكُمۡ يُوحَىٰٓ إِلَيَّ أَنَّمَآ إِلَٰهُكُمۡ إِلَٰهٞ وَٰحِدٞۖ فَمَن كَانَ يَرۡجُواْ لِقَآءَ رَبِّهِۦ فَلۡيَعۡمَلۡ عَمَلٗا صَٰلِحٗا وَلَا يُشۡرِكۡ بِعِبَادَةِ رَبِّهِۦٓ أَحَدَۢا
“বলুন, আমি তো তোমাদের মত একজন মানুষ, আমার প্রতি ওহী হয় যে, তোমাদের ইলাহ একমাত্র সত্য ইলাহ। কাজেই যে তার রবের সাক্ষাত কামনা করে, সে যেন সৎকাজ করে ও তার রবের ‘ইবাদতে কাউকেও শরীক না করে।” [সূরা আল কাহফ: ১১০]
আবু সাঈদ আল-খুদরি রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
أَنَا سَيِّدُ وَلَدِ آدَمَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلاَ فَخْرَ وَبِيَدِي لِوَاءُ الْحَمْدِ وَلاَ فَخْرَ وَمَا مِنْ نَبِيٍّ يَوْمَئِذٍ آدَمُ فَمَنْ سِوَاهُ إِلاَّ تَحْتَ لِوَائِي وَأَنَا أَوَّلُ مَنْ تَنْشَقُّ عَنْهُ الأَرْضُ وَلاَ فَخْرَ
“আমি কিয়ামতের দিবসে সকল আদম সন্তানের নেতা হব। এতে গর্বের কিছু নেই। আমার হাতেই হামদের (প্রশংসার) পতাকা থাকবে। এতেও গর্বের কিছু নেই। সেদিন আমার পতাকার নিচেই আদম (আঃ) এবং অন্য সকল নবী একত্রিত হবেন। আমিই প্রথম ব্যক্তি যার জন্য জমিন বিদীর্ণ করা হবে (অর্থাৎ আমাকেই সর্বপ্রথম উত্থিত করা হবে)। এতেও গর্বের কিছু নেই।” [সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত) ৪৪/ রাসূল সা. এর তাফসীরুল কুরআন, পরিচ্ছেদ: ১৮. সূরা বানী ইসরাঈল]
আবার তিনি নুর (আলো) ছিলেন তাও সত্য। অর্থাৎ তিনি ছিলেন আলোকিত-জ্যোতির্ময় মহামানব এবং বিশ্ববাসীর জন্য আলোকবর্তিকা। কারণ তিনি মিথ্যা, পাপাচার ও অন্যায়ভরা পৃথিবীতে সত্যে ও ন্যায়ের আলো ছড়িয়েছেন। কুফরি ও অবিশ্বাসের নিকষ কালো অন্ধকারে তাওহিদ ও ঈমানের আলো জ্বালিয়েছে। ভ্রষ্টতা, অজ্ঞতা ও কুসংস্কারে অমানিশায় জ্ঞানের মশাল প্রজ্বলিত করেছেন। সে অর্থে তিনি অবশ্যই এক মহান আলোকবর্তিকা ও আলোকিত মানুষ।
এ মর্মে আল্লাহ তাআলা বলেন,
قَدۡ جَآءَكُم مِّنَ ٱللَّهِ نُورٞ وَكِتَٰبٞ مُّبِين – يَهۡدِي بِهِ ٱللَّهُ مَنِ ٱتَّبَعَ رِضۡوَٰنَهُۥ سُبُلَ ٱلسَّلَٰمِ وَيُخۡرِجُهُم مِّنَ ٱلظُّلُمَٰتِ إِلَى ٱلنُّورِ بِإِذۡنِهِۦ وَيَهۡدِيهِمۡ إِلَىٰ صِرَٰطٖ مُّسۡتَقِيمٖ
“অবশ্যই আল্লাহর নিকট থেকে এক জ্যোতি (নুর) ও স্পষ্ট কিতাব তোমাদের কাছে এসেছে । যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির অনুসরণ করে, এ দ্বারা তিনি তাদেরকে শান্তির পথে পরিচালিত করেন এবং তাদেরকে নিজ অনুমতিক্রমে অন্ধকার হতে বের করে আলোর দিকে নিয়ে যান। আর তাদেরকে সরল পথের দিশা দেন।” [সূরা আল মায়িদাহ: ১৫ ও ১৬]
আমাদের অজানা নয় যে, বর্তমানে অসংখ্য গজল, নাতে রাসূল এবং ইসলামি সঙ্গীতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে উদ্দেশ্য করে ‘নূরে মুজাসসাম’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, অনেক বিদাতি লেখকেরে বই-পুস্তকে এবং বিদাতি বক্তাদের বক্তৃতায় এ শব্দটি ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু আমাদের জানা আবশ্যক যে, এটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, সাহাবি ও তাবেঈগণের ব্যবহৃত শব্দ নয়। বরং একটি বাতিল আকিদার পরিস্ফুটন ও নির্দেশক শব্দ। তাই আমাদের জন্য এ শব্দটির ব্যবহার বর্জন করা অবশ্য কর্তব্য।
❑ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রশংসায় অতিরঞ্জন নিষিদ্ধ:
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অবশ্যই অসংখ্য গুণাবলি ও বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন দুনিয়ার শ্রেষ্ঠতম মানুষ। কিন্তু তাই বলে তার প্রশংসায় বাড়াবাড়ি করা বৈধ নয়। তিনি নিজেই তার উম্মতকে এ ব্যাপারে সাবধান করে গেছেন। তিন বিগত উম্মতের এই প্রকারের বাড়াবাড়ি লক্ষ্য করেছিলেন এবং নিজ উম্মতের মধ্যেও তার আশংকা করেছিলেন। তাই তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন,
لا تُطْرُونِي كَمَا أَطْرَتْ النَّصَارَى ابْنَ مَرْيَمَ فَإِنَّمَا أَنَا عَبْدُهُ فَقُولُوا عَبْدُ اللَّهِ وَرَسُولُهُ
“তোমরা আমাকে নিয়ে বাড়াবাড়ি করবে না, যেমন নাসারারা (খ্রিস্টান সম্প্রদায়) মরিয়মের পুত্র (ঈসা আলাইহিস সালাম) এর ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করেছে। নিঃসন্দেহে আমি হলাম, তাঁর বান্দা (ভৃত্য, গোলাম ও দাস) মাত্র। অত:এব তোমরা আমাকে ‘আল্লাহর বান্দা এবং তাঁর রাসূল’ বলো।’’ [বুখারি ও মুসলিম]
তিনি আরও বলেন,
إيّاكم والغُلُوّ، فإنّما أُهلِكَ من كانَ قبلكم الغلوّ
‘‘অতিরঞ্জন হতে সাবধান! কারণ অতিরঞ্জনই তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতকে ধ্বংস করেছে।’’ [সহিহ বুখারি]
আল্লাহ তাআলা আমদের প্রিয় নবীর প্রতি যথার্থ প্রক্রিয়ায় ভালবাসা প্রকাশ, তাঁর অকুণ্ঠ আনুগত্য, তাঁর আদেশ-নিষেধ মেনে চলার তাওফিক দান করুন এবং তার বিরুদ্ধাচরণ, তার দেখানো পথ ও পদ্ধতির বাইরের সকল বিদআতি ও সুন্নাহ বিরোধী কার্যক্রম এবং তার প্রশংসার নামে অতিরঞ্জন থেকে রক্ষা করুন। আমিন।
◍ ◍ ◍ ◍ ◍ ◍ ◍ ◍ ◍ ◍ ◍
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
(লিসান্স, মদিনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়)।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সউদি আরব।
Share On Social Media