কোরআন ও সহীহ সুন্নাহ ভিত্তিক প্রশ্নোত্তর প্রচার করাই হল এই ওয়েবসাইটের মূল উদ্দেশ্য।।

জিলহজের ১ম দশকের দিনগুলোর প্রত্যেক দিনের রোজা এক বছরের রোজার ন্যায় আর এর প্রত্যেক রাতের তাহাজ্জুদের সালাত লাইলাতুল কদরের ন্যায়। এ হাদিসটি কি সহিহ

প্রশ্ন: নিমোক্ত হাদিসটা কি সহিহ? জানালে উপকৃত হবো। কারণ ফেসবুকে এ হাদিস টা অনেকেই প্রচার করছে। তা হল:

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “আল্লাহর নিকট জিলহজের দশ দিনের ইবাদতের তুলনায় আর কোনো দিনের ইবাদতই অধিক প্রিয় নয়। এই দিনগুলোর প্রত্যেক দিনের সিয়াম এক বছরের সিয়ামের ন্যায় আর এর প্রত্যেক রাতের তাহাজ্জুদের সালাত লাইলাতুল কদরের ন্যায়।”
[ইবনে মাজাহ, ৭/১৮০০, তিরমিযী, বাযযার প্রমূখ ]

উত্তর:

এ হাদিসের দুটি অংশের মধ্যে প্রথম অংশটি সহিহ কিন্তু ২য় অংশটি জইফ বা দুর্বল।

বিস্তারিত বিবরণ নিম্নরূপ:

◯ ১ম অংশ:

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “আল্লাহর নিকট জিলহজের ১ম দশ দিনের ইবাদতের তুলনায় আর কোনও দিনের ইবাদতই অধিক প্রিয় নয়।” এ অংশটুকুর মর্মার্থ বিশুদ্ধ। কারণ সহিহ বুখারি সহ একাধিক সহিহ হাদিসে এর সমার্থবোধক হাদিস বর্ণিত হয়েছে। যেমন:

◈ আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
مَا مِنْ أَيَّامٍ الْعَمَلُ الصَّالِحُ فِيهَا أَحَبُّ إِلَى اللَّهِ مِنْ هَذِهِ الأَيَّامِ، [يَعْنِى أَيَّامَ الْعَشْرِ]. قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ: وَلاَ الْجِهَادُ في سَبِيلِ اللَّهِ؟ قَالَ: وَلاَ الْجِهَادُ في سَبِيلِ اللَّهِ، إِلاَّ رَجُلٌ خَرَجَ بِنَفْسِهِ وَمَالِهِ فَلَمْ يَرْجِعْ مِنْ ذَلِكَ بِشَيءٍ
“জিলহজের প্রথম দশকের চেয়ে উত্তম এমন কোন দিন নেই, যে দিনগুলোর সৎ আমল আল্লাহর নিকট অধিক পছন্দনীয়।”
সাহাবিগণ জিজ্ঞেস করলেন: আল্লাহ্‌র পথে জিহাদও নয় হে আল্লাহর রাসূল?
তিনি বললেন: “আল্লাহ্‌র পথে জিহাদও নয়। অবশ্য সেই মুজাহিদের কথা ভিন্ন, যে জান-মাল নিয়ে জিহাদে বেরিয়ে পড়ে কিন্তু আর কোন কিছুই নিয়ে ফিরে আসে না (অর্থাৎ আল্লাহর পথে শহীদ হয়ে যায়)।” (বুখারি)

এ ছাড়াও হাদিসে এসেছে, ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
مامن أيّام أعظم عند الله سبحانه ولا أحب إليه العمل فيهن من هذه الأيام العشر، فأكثروا فيهن من التهليل والتكبير والتحميد
“এ দশ দিনের তুলনায় অন্য কোন সময় আল্লাহর নিকট এতটা মর্যাদা পূর্ণ নয় বা তাতে আমল করা এতটা পছন্দনীয় নয়। সুতরাং এ দিনগুলোতে তোমরা অধিক পরিমাণে তাহলীল (লা-ইলা-হা ইল্লাল্লাহ), তাকবীর (আল্লাহু আকবার) ও তাহমীদ (আল হামদুলিল্লাহ) পাঠ কর।” (মুসনাদ আহমদ)

◯ ২য় অংশ:

হাদিসের ২য় অংশটুকু মুহাদ্দিসদের মতে জইফ (দুর্বল)। তা হল:
يعدِلُ صيامُ كلِّ يومٍ منها بصيامِ سنةٍ وقيامِ كلِّ ليلةٍ منها بقيامِ ليلةِ القدرِ
“এই দিনগুলোর প্রত্যেক দিনের সিয়াম এক বছরের সিয়ামের ন্যায় আর এর প্রত্যেক রাতের তাহাজ্জুদের সালাত লাইলাতুল কদরের ন্যায়।”

এ হাদিসটিকে যে সকল মুহাদ্দিস জঈফ বলেছেন তাদের কয়েকজন হলেন:

● ইমাম বাগাবি বলেন, এ হাদিসটি জইফ বা দুর্বল। (শারহুস সুন্নাহ ২/৬২৪)
● ইবনে তাইমিয়া বলেন, এর মধ্যে দুর্বলতা রয়েছে। [শারহুল উমদা (সিয়াম) ২/৫৫৫]
● আদ দিমিয়াত্বী বলেন, سنده سقيم “এর সনদ অসুস্থ/দুর্বল।” (আল মাতজার আর রাবেহ-১৫৪)
● আল মুনাবি বলেন, এর সনদে النهاس بن قهم আন নাহহাস নামক একজন বর্ণনাকারী আছে-যাকে মুহাদ্দিসগণ দুর্বল বলে আখ্যায়িত করেছেন। (তাখরিজ আহাদীসিল মাসাবীহ, ১/৫৩৭)
● মোবারক পূরী বলেন, জইফ। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৩/১৮০)
● শাইখ আলবানি বলেন, জইফ। (যইফুত তিরমিযী, ৭৫৮)
এ ছাড়াও আরও অনেক মুহাদ্দিস এ হাদিসটিকে জইফ বলে আখ্যায়িত করেছেন। যেমন:
قال الترمذي رحمه الله :
” هذا حديث غريب ، لا نعرفه إلا من حديث مسعود بن واصل ، عن النهاس .

وسألت محمدا – يعني البخاري – عن هذا الحديث فلم يعرفه من غير هذا الوجه مثل هذا .

وقد روي عن قتادة ، عن سعيد بن المسيب ، عن النبي صلى الله عليه وسلم مرسلا شيء من هذا . وقد تكلم يحيى بن سعيد في نهاس بن قهم من قبل حفظه ” انتهى.
يقول الحافظ ابن رجب رحمه الله – بعد أن أورد هذا الحديث وغيره في الباب :

” وفي المضاعفة أحاديث أخر مرفوعة ، لكنها موضوعة ، فلذلك أعرضنا عنها وعما أشبهها من الموضوعات في فضائل العشر ، وهي كثيرة ” انتهى.

” لطائف المعارف ” (ص/262)
অত:এব, আসুন, আমরা জিলহজ মাসের ১ থেকে ১০ তারিখের মধ্যে অধিক পরিমাণে দুআ, দরুদ, জিকির, তাসবিহ, ইস্তিগফার, কুরআন তিলাওয়াত, নফল সালাত (যেমন: তাহাজ্জুদ, সালাতুয যুহা বা চাশত, তাহিয়াতুল ওজু, সালাতুত তওবা ইত্যাদি) সিয়াম (বিশেষ করে আরাফা দিবসের সওম), ঈদের দিন পশু কুরবানি, হজের সময় হজ, দান-সদকা, রক্ত সম্পর্কিত আত্মীয়দের সাথে সুসম্পর্ক, আল্লাহর পথে দাওয়াত, এতিম ও বিধবা ও বিপদগ্রস্থদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা করা ইত্যাদি যত প্রকার নেকির কাজ রয়েছে করার চেষ্টা করি।

তবে ‘এ দশ দিনের মধ্যে দিনে রোজা রাখলে প্রতিটি রোজার বিনিময়ে এক বছরের রোজা এবং রাতে নফল সালাত আদায় করলে প্রতিটি রাতের বিনিময়ে লাইলাতুল কদরের সমপরিমাণ সওয়াব হবে’ এই ফযিলতের বিষয়টি ১০০% নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করা যাবে না। কারণ এ মর্মে হাদিসটি বিশুদ্ধ সনদে প্রমাণিত হয় নি। তবে এ দিনগুলোতে রোজা রাখা আর রাতে নফল সালাত তথা তাহাজ্জুদ সালাত আদায় করা অন্যান্য সময়র তুলনায় আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয় এবং সর্বাধিক সওয়াবের তা অন্যান্য সহিহ হাদিস দ্বারা সাব্যস্ত হয়েছে। সুতরাং এ সব আমলের দ্বারা অবারিত সওয়াব অর্জিত হবে তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় আল হামদুলিল্লাহ।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে জিলহজ মাসের ১ম দশকের হাতে গোনা এ কয়েকটি দিনকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করার মাধ্যমে আমাদের আমলনামাগুলোকে নেকি দ্বারা পূর্ণ করে নেয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।
আল্লাহু আলাম।
▬▬▬◆◯◆▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড সেন্টার, সৌদি আরব।

Share This Post