গর্ভধারণ, প্রসব বেদনা এবং সন্তানকে দুগ্ধ দানের ফজিলত এবং এ সম্পর্কে একটি প্রসিদ্ধ বানোয়াট হাদিস

নিঃসন্দেহে নারীদের গর্ভধারণ, সন্তান ভূমিষ্ঠ করা, দুগ্ধ দান, সন্তান পরিচর্যা করা ইত্যাদি বিশাল সওয়াবের কাজ। এ কারণে তার যে পরিমাণ ক্লান্তি, কষ্ট, বেদনা, পরিশ্রম, নির্ঘুম নিশি জাগরণ, অসহনীয় ঠাণ্ডা সহ্য করা সহ নানা ধরণের ত্যাগ স্বীকার করতে হয় সে কারণে মহান আল্লাহ তাআলা তাকে সওয়াব দান করেন, তার গুনাহ মোচন করেন এবং আখিরাতে তার মর্যাদা বৃদ্ধি করেন। এ মর্মে বিশেষ কোন হাদিস পাওয়া না গেলেও রোগব্যাধি ও কষ্ট-ক্লান্তি সংক্রান্ত সাধারণ হাদিসগুলো থেকে এমনটি প্রমাণিত হয়। যেমন:

◍ আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

مَا يُصِيبُ الْمُسْلِمَ مِنْ نَصَبٍ وَلاَ وَصَبٍ وَلاَ هَمٍّ وَلاَ حُزْنٍ وَلاَ أَذًى وَلاَ غَمٍّ حَتّٰى الشَّوْكَةِ يُشَاكُهَا إِلاَّ كَفَّرَ اللهُ بِهَا مِنْ خَطَايَاهُ

“মুসলিম ব্যক্তির উপর যে কষ্ট-ক্লেশ, রোগ-ব্যাধি, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, দুশ্চিন্তা, কষ্ট ও পেরেশানি আসে, এমনকি যে কাঁটা তার দেহে ফুটে, এ সবের মাধ্যমে আল্লাহ তার গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেন।” সহিহ বুখারি (তাওহীদ পাবলিকেশন), অধ্যায়: ৭৫/ রোগী, পরিচ্ছেদ: ৭৫/১. রোগের কাফফারা (ক্ষতিপূরণ]

◍ অন্য বর্ণনায় এসেছে,

مَا مِنْ مُؤْمِنٍ تَشُوكُه شَوْكَةٌ فَمَا فَوْقَهَا إِلَّا حَطَّ اللهُ عَنْهُ خَطِيئَةً وَرَفَعَ لَه بِهَا دَرَجَةً

“যে কোন মুমিনের গায়ে এই দুনিয়ায় একটি কাঁটা বিঁধে বা এর চেয়ে বেশি কিছু ভোগ করে (কষ্ট পায়) তাহলে আল্লাহ তাআলা তার একটি গুনাহ মোচন করেন এবং এর বিনিময়ে তার একটি মর্যাদা উন্নীত করেন।” [মুসনাদে আহমদ, সহীহ]

◍ শুধু তাই নয়, সন্তান পেটে থাকা অবস্থায় বা প্রসবের সময় এমনকি প্রসূতি অবস্থায় মুমিন নারী মারা গেলে তিনি শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করবেন ইনশাআল্লাহ। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

الشُّهَدَاءُ سَبْعَةٌ سِوَى الْقَتْلِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ ، الْمَطْعُونُ شَهِيدٌ ، وَالْغَرِقُ شَهِيدٌ ، وَصَاحِبُ ذَاتِ الْجَنْبِ شَهِيدٌ ، وَالْمَبْطُونُ شَهِيدٌ ، وَالْحَرِقُ شَهِيدٌ ، وَالَّذِي يَمُوتُ تَحْتَ الْهَدْمِ شَهِيدٌ ، وَالْمَرْأَةُ تَمُوتُ بِجُمْعٍ شَهِيدٌ

“আল্লাহর রাস্তায় নিহত ব্যক্তি ছাড়া আরও সাত জন শহিদ রয়েছে। তারা হল :
(১) মহামারীতে মৃত (মুমিন) ব্যক্তি শহিদ।
(২) পানিতে ডুবে মৃত ব্যক্তি শহিদ।
(৩) ‘যাতুল জাম্ব’ নামক কঠিন রোগে মৃত ব্যক্তি শহিদ।
[ইবনে হাজার বলেন, التي تموت وفي بطنها ولد
“যে গর্ভবতী নারী পেটে বাচ্চা থাকা অবস্থায় মৃত্যু বরণ করে।” [ফাতহুল বারী]
(৪) পেটের পীড়ায় মৃত ব্যক্তি শহিদ।
(৫) আগুনে পুড়ে মৃত ব্যক্তি শহিদ।
(৬) চাপা পড়ে মৃত ব্যক্তি শহিদ।
(৭) এবং গর্ভাবস্থায় মৃত মহিলা।”
[আবু দাউদ, নাসাঈ, মিশকাত হা/১৫৬১; সহীহ আত-তারগীব হা/১৩৯৮]।

অন্য বর্ণনায় রয়েছে,
والنُّفساء يجرها ولدها بسُرَرِها إلى الجَنَّة
“প্রসূতি নারী যার সন্তান নাড়ীসহ তাকে জান্নাতে টেনে নিয়ে যায়।” [মুসনাদে আহমদ হা/১৬০৪১, সনদ সহিহ লিগাইরিহ]।

◍ বিশেষ করে কোনও গর্ভবতী নারী যদি সন্তান প্রসব কালীন অসহ্য যন্ত্রণার সময় রাব্বুল আলামিনের নিকট দুআ করে তাহলে আশা করা যায়, তিনি তার সে সময়কার দুআ কবুল করবেন। কেননা আল্লাহ তাআলা বলেন,

أَمَّن يُجِيبُ الْمُضْطَرَّ إِذَا دَعَاهُ وَيَكْشِفُ السُّوءَ

“বল তো, কে অসহায়ের ডাকে সাড়া দেন যখন সে ডাকে এবং কষ্ট দূরীভূত করেন?” [সূরা নামল: ৬২]

❑ গর্ভধারণ, প্রসব বেদনা এবং দুগ্ধ দান সম্পর্কে নিম্নোক্ত প্রসিদ্ধ হাদিসটি বানোয়াট:

أفما ترضى إحداكن أنها إذا كانت حاملا من زوجها وهو عنها راض أن لها مثل أجر الصائم القائم في سبيل الله ، فإذا أصابها الطلق لم يعلم أهل السماء وأهل الأرض ما أخفي لها من قرة أعين ، فإذا وضعت لم يخرج منها جرعة من لبنها ، ولم يمص مصة ، إلا كان لها بكل جرعة وبكل مصة حسنة ، فإن أسهرها ليلة كان لها مثل أجر سبعين رقبة تعتقهن في سبيل الله
رواه الطبراني في “المعجم الأوسط” (7/20)، وأبو نعيم في “معجم الصحابة” (رقم/7049)، وابن عساكر في “تاريخ دمشق” (43/347)، وابن الجوزي في “الموضوعات” (2/274) وغيرهم

“তোমাদের কেউ কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, যখন তোমাদের স্বামী তোমাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকা অবস্থায় তোমরা স্বামীর পক্ষ থেকে গর্ভধারিণী হও, তখন তোমরা আল্লাহর পথে রোজাদারের সমান সওয়াবের ভাগীদার হও। আর যখন প্রসব বেদনা শুরু হয়, তখন আসমান ও জমিনের অধিবাসী কেউ জানে না, তার জন্য চক্ষু শীতলকারক কি পুরস্কার লুকায়িত থাকে। আর যখন প্রসব হয়ে যায়, তখন নবজাতকের দুধ পানের প্রতিটি ঢোক এবং প্রতিটি চোষণের বিনিময়ে একটি করে নেকি লেখা হয়।
আর যদি নবজাতকের কারণে জাগ্রত থাকতে হয়, তাহলে প্রতিটি রাতের বিনিময়ে সত্তরটি ক্রীতদাস আল্লাহর রাস্তায় মুক্ত করার সওয়াব দেওয়া হয়। [আল মু’জামুল আওসাত লিততাবরানী, হাদীস নং-৭/২০, মুজামুস সাহাবা, হা/৭০৪৯, তারিখে দিমাশক ৪৩/৩৭৪]

❑ হাদিসটির মান এবং এ সম্পর্কে মুহাদ্দিসগণের অভিমত ও সনদ বিশ্লেষণ:

‌এটি একটি বানোয়াট হাদিস।

◈ ইবনুল জাওযি এটি তার বিখ্যাত আল মাওযুয়াত শীর্ষক বানোয়াট হাদিস সংকলন গ্রন্থে সন্নিবেশিত করেছেন। [২/২৭৪]
◈ ইবনুল হিব্বান এটিকে ‘বানোয়াট’ হিসেবে হুকুম লাগিয়েছেন। [কিতাবুল মাজরূহীন, ২/৩৪]
◈ সুয়ুতিও এটিকে বানোয়াট হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেছেন। [আল লাআলি আল মাসনুয়াহ, ২/১৭৫]

এই হাদিসের বর্ণনা সূত্রে আবু সাঈদ আল খাওলানি নামক যে বর্ণনা কারী আছে তার ব্যাপারে ইমাম জাহাবি বলেন, حدث بموضوعات “তিনি অনেক বানোয়াট হাদিস বর্ণনা করেছেন।” তারপর এ হাদিসটি উল্লেখ করেন।

ইবনে হিব্বান বলেন,
عمرو بن سعيد الذي يروي هذا الحديث الموضوع عن أنس ; لا يحل ذكره إلا على جهة الاعتبار للخواص
“আমর বিন সাঈদ (আল খাওলানি) আনাস রা. থেকে উক্ত বানোয়াট হাদিস বর্ণনা করে থাকে। তাই হাদিস বিশেষজ্ঞ জনদের (হাদিস বিশারদগণের) নিকট এ বিষয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা এবং এই বর্ণনাকারীর ভ্রান্তি প্রকাশের উদ্দেশ্য ছাড়া তা উল্লেখ করা জায়েজ নয়।” [সিলসিলা যঈফা-শাইখ আলবানি, হা/২০৫৫-সংক্ষেপায়িত] (সূত্র: islamqa) আল্লাহু আলাম।▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

Share On Social Media