কেউ বলে যে, আল্লাহ্‌ কে ভয় না করে ভালোবাসা উচিত কথাটি কতটুকু যুক্তিযুক্ত

প্রশ্ন: কেউ বলে যে, “আল্লাহ্‌ কে ভয় না করে ভালোবাসা উচিত।” কথাটি কতটুকু যুক্তিযুক্ত?

উত্তর:

“আল্লাহ্‌ কে ভয় না করে ভালোবাসা উচিত।” এটি কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী কথা যা বলে থাকে সুফি বিদআতিরা। অথচ কুরআন ও হাদিসে আল্লাহকে ভালবাসার কথা যেমন এসেছে তেমনি ভয় করার কথাও এসেছে।
আল্লাহকে ভয় করার ব্যাপারে প্রচুর আয়াত ও হাদিস রয়েছে। বরং প্রত্যেক নবী ও রাসূল তাঁদের উম্মতকে ‘আল্লাহর ভয়’ এর ব্যাপারে ওসিয়ত করে গিয়েছেন।

🌓 আল্লাহকে ভয় করা সংক্রান্ত কতিপয় আয়াত:

🔷 আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ

“হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে যেমন ভয় করা উচিৎ ঠিক তেমনিভাবে ভয় করতে থাক এবং অবশ্যই মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না।”[সূরা আলে ইমরান আয়াত নং- ১০২]

🔷 তিনি আরও বলেন,
يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَاءً ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ ۚ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا
“হে মানব সমাজ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি তার থেকে তার সঙ্গিনীকে সৃষ্টি করেছেন; আর বিস্তার করেছেন তাদের দুজন থেকে অগণিত পুরুষ ও নারী। আর আল্লাহকে ভয় কর, যাঁর নামে তোমরা একে অপরের নিকট যাচঞ্ঝা করে থাক এবং আত্মীয় জ্ঞাতিদের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন কর। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ব্যাপারে সচেতন রয়েছেন।” [সূরা আন নিসা, আয়াত নং- ১]

🔷 তিনি আরও বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَقُولُوا قَوْلًا سَدِيدًا يُصْلِحْ لَكُمْ أَعْمَالَكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ ۗ وَمَن يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ فَازَ فَوْزًا عَظِيمًا
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল তাহলে তিনি তোমাদের আমল-আচরণ সংশোধন করবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করবেন। যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করে, সে অবশ্যই মহা সাফল্য অর্জন করবে।”
[সূরা আল আহযাব , আয়াত নং- ৭০-৭১ ]

🔷 তিনি আরও বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَلْتَنظُرْ نَفْسٌ مَّا قَدَّمَتْ لِغَدٍ ۖ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۚ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ
“হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ তাআলাকে ভয় কর। প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত, আগামী কালের জন্যে সে কি প্রেরণ করে, তা চিন্তা করা। আল্লাহ তাআলাকে ভয় করতে থাক। তোমরা যা কর,
আল্লাহ তাআলা সে সম্পর্কে খবর রাখেন।”
[সূরা আল হাশর , আয়াত নং- ১৮]
এমন অসংখ্য আয়াত বিদ্যমান রয়েছে আলহামদু লিল্লাহ।

অনুরূপভাবে আল্লাহকে ভালবাসা সংক্রান্ত আয়াত-হাদিসেরও অভাব নাই।

🌗 নিম্নে আল্লাহকে ভালোবাসা সংক্রান্ত কতিপয় আয়াত ও হাদিস তুলে ধরা হলো:

🔶 আল্লাহ তাআলা বলেন,
قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ ۗ
“(হে রাসুল!) আপনি বলুন, যদি তোমরা প্রকৃতই আল্লাহকে ভালবাসতে চাও, তবে আমার অনুসরণ কর, তবেই আল্লাহ তোমাদের ভালবাসবেন এবং তোমাদের গোনাহ ক্ষমা করবেন। আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল দয়ালু।” [সূরা আলে ইমরান: ৩১]

🔶 তিনি আরও বলেন,

يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ مَن يَرۡتَدَّ مِنكُمۡ عَن دِينِهِۦ فَسَوۡفَ يَأۡتِي ٱللَّهُ بِقَوۡمٖ يُحِبُّهُمۡ وَيُحِبُّونَهُۥٓ أَذِلَّةٍ عَلَى ٱلۡمُؤۡمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى ٱلۡكَٰفِرِينَ يُجَٰهِدُونَ فِي سَبِيلِ ٱللَّهِ وَلَا يَخَافُونَ لَوۡمَةَ لَآئِمٖۚ ذَٰلِكَ فَضۡلُ ٱللَّهِ يُؤۡتِيهِ مَن يَشَآءُۚ وَٱللَّهُ وَٰسِعٌ عَلِيمٌ
“হে মুমিনগণ! তোমাদের মধ্যে কেউ দীন থেকে ফিরে গেলে নিশ্চয়ই আল্লাহ এমন এক সম্প্রদায় আনবেন যাদেরকে তিনি ভালোবাসবেন এবং যারা তাঁকে ভালোবাসবে; তারা মুমিনদের প্রতি কোমল ও কাফেরদের প্রতি কঠোর হবে; তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে এবং কোনো নিন্দুকের নিন্দার ভয় করবে না ; এটা আল্লাহর অনুগ্রহ, যাকে ইচ্ছে তাকে তিনি তা দান করেন এবং আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ ।”

-Surah Al-Ma’idah, Ayah 54

🔶 সহিহ বুখারি ও মুসলিমে আনাস রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

ثلاث من كن فيه وجد بهن حلاوة الإيمان من كان الله ورسوله أحب إليه مما سواهما وان يحب المرء لا يحبه إلا الله وان يكره أن يعود في الكفر بعد أن أنقذه الله منه كما يكره أن يقذف في النار

‘তিনটি জিনিস যার মধ্যে রয়েছে, সে ঈমানের প্রকৃত স্বাদ অনুভব করতে পেরেছে।
১. যার কাছে আল্লাহ্ ও তার রাসূল সবচেয়ে বেশী প্রিয়।
২. কেবলমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই অন্যকে ভালোবাসে।
৩. যাকে আল্লাহ্ কুফর থেকে মুক্তি দিয়েছেন, সে পুনরায় কুফরের দিকে ফিরে যাওয়াকে এমন অপছন্দ করে যেমন অপছন্দ করে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে।”
[সহীহ্ আল বুখারী, ঈমান অধ্যায়; যে গুণে গুণান্বিত হলে ঈমানের স্বাদ পাওয়া যায় শিরোনামে। সহীহ মুসলিম, ঈমান অধ্যায়; যেসব গুণে গুণান্বিত হলে ঈমানের স্বাদ পাওয়া যায়’ শিরোনাম। অবশ্য সহীহ মুসলিমের হাদীসে দুয়েকটি শব্দের পার্থক্যও রয়েছে।]

এ বিষয়ে পর্যাপ্ত পরিমাণে আয়াত ও হাদিস বিদ্যমান রয়েছে আলহামদুলিল্লাহ।

মোটকথা, আল্লাহ তাআলাকে অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে এমনভাবে ভালবাসতে হবে যে, তার মত আর কাউকে ভালবাসা যাবে না। ঠিক একইভাবে তাকে এমনভাবে ভয় করতে হবে যে, তার মত আর কাউকে ভয় পাওয়া যাবে না। বরং আল্লাহকে ভালবাসার পাশাপাশি ভয় পাওয়া ইবাদতের অন্যতম রোকন বা খুঁটি।

আলেমগণ বলেন, ইবাদতের রোকন বা খুঁটি হল, তিনটি। যথা:
✔️ ক. আল্লাহকে ভয় করা,
✔️ খ. তাঁকে ভালোবাসা।
✔️ গ. তাঁর কাছে আশা-আকাঙ্ক্ষা করা।
ইবাদতে এই তিনটি খুঁটির কোন একটি না থাকলে তা ইবাদত বলেই গণ্য হবে না।

সুতরাং উপরোক্ত “আল্লাহ্‌ কে ভয় না করে ভালোবাসা উচিত” এই শরিয়া বিরোধী বিদআতি কথা দূরে থাকা জরুরি। বরং মুক্তিকামী মুমিনের কর্তব্য হল, হৃদয়ে সবোর্চ্চ পর্যায়ের আল্লাহর ভয়, তাঁর প্রতি অকুণ্ঠ ভালবাসা এবং বুকভরা আশা-আকাঙ্খা অটুট রেখে একনিষ্ঠভাবে তাঁর ইবাদত করা।
আল্লাহ তাওফিক দান করুন। আমিন।

উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
(দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব)।

Share On Social Media