কুরআনের তরজমা পড়লে কি কুরআন পড়ার সওয়াব হবে

প্রশ্ন: আমি শুধু কুরআনুল কারিমের অর্থ পড়ি। এতে কি সওয়াব হবে?
উত্তর:
কুরআনের অর্থ পড়া মূলত ‘কুরআন বুঝা’ এবং ‘কুরআনের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ পড়া’ এর অন্তর্ভুক্ত। এটিকে ‘কুরআন তিলাওয়াত’ বলা হয় না। কুরআন তিলাওয়াত করতে হলে অবশ্যই কুরআনের মূল ভাষা তথা হুবহু আরবিতে পাঠ করতে হবে। কেননা কুরআন হল, বিশ্ব চরাচরের অধিপতি মহান আল্লাহর বাণী সমষ্টির নাম যা তিনি জিবরাইল আ. এর মারফতে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর আরবি ভাষায় অবতীর্ণ করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَإِنَّهُ لَتَنزِيلُ رَبِّ الْعَالَمِينَ ‎﴿١٩٢﴾‏ نَزَلَ بِهِ الرُّوحُ الْأَمِينُ ‎﴿١٩٣﴾‏ عَلَىٰ قَلْبِكَ لِتَكُونَ مِنَ الْمُنذِرِينَ ‎﴿١٩٤﴾‏ بِلِسَانٍ عَرَبِيٍّ مُّبِينٍ ‎﴿١٩٥﴾

“এই কুরআন তো বিশ্ব-জাহানের পালনকর্তার নিকট থেকে অবতীর্ণ। বিশ্বস্ত ফেরেশতা (জিবরাইল আ.) একে নিয়ে অবতরণ করেছে। আপনার অন্তরে, যাতে আপনি ভীতি প্রদর্শনকারীদের অন্তর্ভুক্ত হন, সুস্পষ্ট আরবি ভাষায়।” [সূরা শুআরা: ১৯২-৯৫]

সুতরাং কুরআনের তরজমা পাঠ করার মাধ্যমে হাদিসে বর্ণিত কুরআন তিলাওয়াতের ফযিলত লাভ করা যাবে না। আর আরবি ভাষায় কুরআন তিলাওয়াত করা হলে ইনশাআল্লাহ প্রতিটি অক্ষরের বিনিময়ে একটি করে নেকি অর্জিত হবে-যা দশটি নেকী সমপরিমাণ। যেমন: আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
مَنْ قَرَأَ حَرْفًا مِنْ كِتَابِ اللَّهِ فَلَهُ بِهِ حَسَنَةٌ وَالْحَسَنَةُ بِعَشْرِ أَمْثَالِهَا لاَ أَقُولُ الم حَرْفٌ وَلَكِنْ أَلِفٌ حَرْفٌ وَلاَمٌ حَرْفٌ وَمِيمٌ حَرْفٌ
“যে ব্যক্তি কুরআনের একটি হরফ পাঠ করবে তার একটি সওয়াব হবে। আর একটি সওয়াব দশটি সওয়াবের অনুরূপ। আমি বলি না যে, “আলিফ-লাম-মীম” একটি হরফ; বরং আলিফ একটি হরফ, লাম একটি হরফ এবং মীম আরেকটি হরফ। (অর্থাৎ তিনটি হরফে রয়েছে তিনটি সওয়াব যা ত্রিশটি সওয়াবের সমান)।” [সুনান তিরমিজী, হা/২৯১০, অনুচ্ছেদ: যে ব্যক্তি কুরআনের একটি হরফ পড়বে তার সাওয়াব কী হবে? অধ্যায়: ৪৮/ কুরআনের ফযিলত -সনদ সহিহ]

সুতরাং যে ব্যক্তি কুরআন তিলাওয়াত করবে সে উক্ত সওয়াব লাভ করবে ইনশাআল্লাহ- চাই বুঝে পড়ুক অথবা না বুঝে পড়ুক, দেখে পড়ুক অথবা মুখস্থ পড়ুক, মুসহাফ দেখে পড়ুক অথবা মোবাইল, ল্যাপটপ ইত্যাদি ডিভাইস থেকে পড়ুক, নামাজের মধ্যে পড়ুক অথবা নামাজের বাইরে পড়ুক।

কিন্তু কুরআন এর অর্থ ও ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ পড়লে এই নেকি পাওয়া যাবে না। অবশ্য কুরআনের মর্মার্থ বোঝার প্রচেষ্টা হিসেবে নেকি হবে ইনশাআল্লাহ। কারণ কুরআন তিলাওয়াত করা যেমন আল্লাহর নির্দেশ তেমনি কুরআনের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ জানাও আল্লাহর নির্দেশ। যেমন:

◈ আল্লাহ তাআলা বলেন,
أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلَىٰ قُلُوبٍ أَقْفَالُهَا
“তারা কি কুরআন সম্পর্কে গভীর চিন্তা করে না? না তাদের অন্তর তালাবন্ধ?” [সূরা মুহাম্মদ: ২৪]
◈ প্রখ্যাত সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ রা. বলেন,
كُنَّا لَا نَتَجَاوَزُ عَـشْرَ آيَاتٍ حَتَّى نَتَعَلَّمَهُنَّ وَنَعْمَلَ بِهِنَّ، وَنُعَلِّمَهُنَّ، وَنَعْلَمَ حَلَالَهُنَّ وَحَرَامَهُنَّ، فَأُوتِينَا العِلْمَ وَالعَمَلَ
“আমরা দশ আয়াত অতিক্রম করতাম না যতক্ষণ না সেগুলো শিখে আমল করতাম এবং সেগুলোর হালাল-হারাম জানতাম। ফলে আমরা ইলম ও আমল দুটাই পেয়েছিলাম।” [সহিহুত তারগিব-আলবানি]

সুতরাং আমাদের কর্তব্য, সওয়াব অর্জন এবং কুরআন থেকে শিক্ষা নেয়ার উদ্দেশ্যে যথাসম্ভব বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত করার পাশাপাশি তার তরজমা ও তাফসির (ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ) জানার চেষ্টা করা।

কুরআনের তরজমা ও তাফসিরের উপর কুরআনের বিধান প্রযোজ্য নয়। সে কারণেই ফকিহগণ বলেছেন, ”জুনুবি তথা স্ত্রী সহবাস, স্বপ্নদোষ, বীর্যপাত ইত্যাদি কারণে (একদল আলেমের মতে ঋতুমতী ও প্রসূতি নারীও এর অন্তর্ভুক্ত) যার উপর গোসল ফরজ হয়েছে এমন নাপাক ব্যক্তির জন্য মূল আরবি কুরআন ব্যতিরেকে কেবল তার তরজমা-তাফসির পাঠ করা দূষণীয় নয়। এবং জুমহুর আলিমের মতে, কুরআনের তরজমা দ্বারা সালাত পড়া হলে তা সহিহ হবে না।

মোটকথা, হাদিসে বর্ণিত কুরআন তিলাওয়াত এর সওয়াব পেতে হলে অবশ্যই তা কুরআনের মূল ভাষা তথা আরবিতে পাঠ করতে হবে। আর নিজ ভাষায় কুরআনের অর্থ এবং তরজমা পড়লে কুরআন তেলাওয়াতের সওয়াব না হলেও তা কুরআনের ব্যাখ্যা জানা এবং বোঝার চেষ্টা হিসেবে পরিগণিত হবে এবং ইনশাআল্লাহ এতেও সওয়াব রয়েছে। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬ ◈❥◈▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
(লিসান্স, মদিনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়)
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সউদি আরব।