কবর পূজার নানা রূপ এবং কবর পূজারীদেরকে চেনার আলামত

প্রশ্ন: কবর পূজা বলতে কী বুঝায়? কবর কেন্দ্রিক শিরক ও বিদআতি কাজগুলো কী কী? কবর পূজারীদেরকে সহজে চেনার কোনও আলামত আছে কী?▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: নিম্নে অতি সংক্ষেপে এই সকল প্রশ্নের উত্তর প্রদান করা হলো: وبالله التوفيق

▪️কবর পূজা বলতে কী বুঝায়?

কবর পূজা বলতে বুঝায়, কবরে শায়িত ওলি বা বুজুর্গের উদ্দেশ্যে কোন ধরনের ইবাদত-বন্দেগি করা যার হকদার কেবল আল্লাহ তাআলা।

▪️কবর পূজার কতিপয় উদাহরণ (শিরকি কার্যক্রম):

ওলি বা বুজুর্গদের কবরে রুকু ও সেজদা করা, তাজিম ও বিনম্রতার সাথে তাদের কবরের সামনে সালাতের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা, বরকত লাভের উদ্দেশ্যে কবরের দেওয়াল স্পর্শ করা বা তাতে শরীর লাগানো বা কাপড় ঘষে তা নিজের বা বাচ্চাদের শরীরে লাগানো, কবরে শায়িত কথিত ওলির-বুজুর্গদের উদ্দেশ্যে গরু, ছাগল, হাস-মুরগি ইত্যাদি মানত করা বা তাদেরকে খুশি করার উদ্দেশ্যে পশু জবেহ করা এবং টাকা-পয়সা, সোনা-গহনা ইত্যাদি দান করা।

অনুরূপভাবে কবরের শায়িত ওলি-বুজুর্গের তার কাছে সন্তান চাওয়া, রোগ-ব্যাধি থেকে মুক্তি চাওয়া, তার কাছে মনোবাসনা তুলে ধরে কাকুতি-মিনতি ও ফরিয়াদ জানানো, বিপদ-আপদে সাহায্য প্রার্থনা করা অথবা দূর থেকে যে কোন সমস্যা, সংকট ও বিপদ-মসিবতে কবরে শায়িত ওলি-বুজুর্গের কথা স্মরণ করে তার নাম জপ করা বা তার কাছে সমস্যা থেকে মুক্তির জন্য প্রার্থনা জানানো।

তদ্রুপ কবরের উপরে মসজিদে নির্মাণ করা, কবরে শায়িত কথিত ওলি বা বুজুর্গের উসিলা ধরে দুআ করা, তার নামে কসম খাওয়া, কবরের ওয়াল বা মাটি ছুঁয়ে কসম করা, কবরের ওলি বা বুজুর্গেরউদ্দেশ্যে মুরাকাবা বা ধ্যানমগ্ন থাকা, কবরের চারপাশে তওয়াফ করা, কবরকে নামাজের স্থান বানিয়ে নেওয়া, কবরকে তাজিম তথা বিনয়-নম্রতা সহকারে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা করা, কবরে শায়িত ওলিকে বিপদ-মসিবতে ত্রাণকর্তা বলে বিশ্বাস করা এবং তার কাছেই বিপদ মুক্তির জন্য আরধনা করা অথবা তাকে উপকার বা ক্ষতি করার ক্ষমতাবান বলে বিশ্বাস করা ইত্যাদি। এগুলো সবাই একমাত্র মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর হক। কোন মাখলুকের উদ্দেশ্যে এগুলো করা শিরকে আকবর বা বড় শিরকের অন্তর্ভুক্ত।‌ ওলি-বুজুর্গদের প্রতি সম্মান-শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার ক্ষেত্রে এগুলো চরম পর্যায়ের বাড়াবাড়ি ও সীমালংঘন। ‌কেউ জেনে-বুঝে এসব কবর পূজা ও শিরকি কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করলে করলে সে ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবে এবং মুশরিক বলে পরিণত হবে। ফলে তার জীবনের সকল নেক আমল বরবাদ হয়ে যাবে, তার জন্য জান্নাত হারাম হয়ে যাবে এবং মূর্তি পূজারী মুশরিকদের মত চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামি হয়ে যাবে।‌ (আল্লাহ হেফাজত করুন। আমিন)

▪️কবর কেন্দ্রিক কতিপয় বিদআতি কার্যক্রম:

মাটি থেকে অনেক উঁচু করে কবর দেওয়া, কবরের উপরে বিল্ডিং নির্মান করা, জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কবরের চারপাশে প্রাচীর বা ওয়াল তৈরি করা, তাতে চুনকাম করা, কবরে মৃত অলি বা বুজুর্গের নাম ফলক লাগানো, ঢোল-তবলা ও নানা ধরনের বাজনা বাজাতে বাজাতে লাশ কবরস্থানে নেওয়া, কবরের উপরে সামিয়ানা টাঙ্গানো বা চাদর চড়ানো, গম্বুজ স্থাপন করা, ফুল দেওয়া, তাতে আতর-সুগন্ধি ও গোলাপ জল ইত্যাদি ছিটানো, কবরে মোমবাতি-আগরবাতি জ্বালানো।

অনুরূপভাবে কথিত বুজুর্গ ও ওলির কবরে বার্ষিক ওরস মাহফিল বা আনন্দ উৎসব করা, ওরসের নামে নাচ-গান করা, নারী-পুরুষ একাকার হয়ে বাজনার তালে তালে গাঞ্জা টানা‌ ও জিকির করা, কবরকে মাজার বলে অভিহিত করা।

মৃতের উদ্দেশ্যে সবিনাখানি, কুলখানি, ফাতেহাখানি, মিলাদ মাহফিল ও দুআ মাহফিলের আয়োজন করা, মৃত্যুবরণের তিন দিন বা সাত দিন পরে জাঁকজমক ভাবে ভোজসভার আয়োজন করা, চল্লিশা পালন করা, মৃত্যুবার্ষিকী উদযাপন করা, কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে দূর দুরান্ত থেকে সফর করা, জানাজা ও দাফনের পরে কিংবা কবর জিয়ারতে গিয়ে দলবদ্ধ ভাবে মোনাজাত করা, লাশ কবরে দাফন করার পরে কবরের সওয়াল-জওয়াবের জন্য উপর থেকে তালকিন দেওয়া ইত্যাদি সবই বিদআতি কাজ ও হারাম।

যারা এই বিষয়গুলোকে জায়েজ মনে করে এবং নিজেরা করে ও অন্যদেরকেও আহ্বান জানায় তারা বিদআতি।

হ্যাঁ, মৃত্যু ও আখেরাতের কথা স্মরণ করার উদ্দেশ্যে যে কোনও কবরে যেকোনো সময় জিয়ারত করা জায়েজ। ইসলামের প্রথম যুগে তাও নিষিদ্ধ ছিল কিন্তু পরবর্তীতে মানুষ তাওহিদ ও শিরক-বিদআত সম্পর্কে দৃঢ় জ্ঞান অর্জন করার পর ইসলামে তা অনুমোদন করা হয়েছে। কিন্তু কবর জিয়ারত করতে গিয়ে সেখানে হাদিসে বর্ণিত সালাম প্রদান এবং তাদের জন্য আল্লাহর কাছে দুআ ছাড়া সূরা ফাতিহা এত বার, তিন কুল ইত্যাদি পাঠ করা বিদআত।

▪️কবর পূজারী চেনার কিছু আলামত:

কবর পূজারীদের পূজার চেনার আলামত হল, তারা‌ যারা কবর পূজা এবং মাজার কেন্দ্রিক শিরক, বিদআত ও অনাচারের বিরুদ্ধে কথা বলে তাদের সাথে চরম মাত্রার শত্রুতা পোষণ করে এবং তাদেরকে ওয়াহাবি, ইয়াজিদের বংশধর, জারজ, গোস্তাখে রাসুল সহ বাপ-দাদা ও চৌদ্দগোষ্ঠী তুলে নানা ধরনের অপবাদ মূলক ও অকথ্য ভাষায় গালাগালি করে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মহব্বতের ক্ষেত্রে অতিভক্তি ও শরিয়তের সীমাতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করে, তাদের কথিত ওয়াজ মাহফিলগুলোতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিংবা অলি-বুজুর্গদের উদ্দেশ্যে নানা ধরনের শান, গান ও‌ গজল গায়, এই সময় তারা হেলে-দুলে বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গিতে নাচানাচি করে বা চিল্লা-ফাল্লা করে, তারা প্রচুর পরিমাণ আজগুবি কিচ্ছা-কাহিনী, বুজুর্গদের কেরামত এবং জাল ও যেই হাদিস বর্ণনা করে।
এরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম-এর প্রতি প্রতিভক্তি দেখাতে গিয়ে তাঁর নাম শোনার সাথে সাথে দুই হাতের বৃদ্ধাঙ্গুল জমা করে ঠোঁটে লাগিয়ে দু চোখে বুলায়, তাদের অনেকেই, বিশেষ করে তাদের মৌলভিরা মাথায় বড়সড়ো সবুজ পাগড়ি পরিধান করে অথবা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথিত জুতার আকৃতি (যাকে নালাইন শরীফাইন বলা হয়) সম্বলিত সবুজ বা বিভিন্ন রংবেরঙের টুপি পরে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সর্বত্র হাজির নাজির বলে বিশ্বাস করে, তাঁর উদ্দেশ্যে দাঁড়িয়ে মিলাদ-কিয়াম করে, তিনি অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ সব অদৃশ্যের খবর জানে বলে বিশ্বাস করে, হায়াতুন্নবী তথা তিনি কবরে দুনিয়ার জীবনের মতই জীবিত আছে বলে বিশ্বাস করে, তাঁকে নুরের তৈরি বলে বিশ্বাস করে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মা-বাবা এবং চাচা আবু তালেবকে পাক্কা মুমিন এবং জান্নাতি বলে বিশ্বাস করে ইত্যাদি।

🔸প্রিয় বন্ধুগণ, এলাকাভিত্তিক কবর ও মাজার কেন্দ্রিক আরও নানা ধরনের‌ শিরক ও বিদআতি কার্যক্রম থাকতে পারে। আপনারা সেগুলো নিচের কমেন্টে উল্লেখ করতে পারেন।
জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।

পরিশেষে, মহান আল্লাহর কাছে দুআ‌ করি, তিনি যেন আমাদেরকে সব ধরনের শিরক, বিদআত ও কুসংস্কার মূলক কার্যক্রম থেকে হেফাজত করে করেন এবং যে সকল পথভ্রষ্ট মানুষ এই সকল কার্যক্রম নিজেরা করার পাশাপাশি অন্যান্য মুসলিমদেরকে সেদিকে আহবান করে তাদেরকে জাহান্নামের পথে আহবান করছে তাদের অনিষ্ট থেকে জাতিকে হেফাজত করেন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

Share On Social Media