ওজু-গোসল ও পাক-পবিত্রতা বিষয়ক জরুরি ২৫টি মাসআলা

প্রশ্ন-১: নাপাক (গোসল ফরজ) অবস্থায় দুআ, তাসবিহ, জিকির-আজকার ইত্যাদি পাঠ করা জায়েজ আছে কি?

উত্তর:
স্ত্রী সহবাস, স্বপ্নদোষ, বীর্যপাত ইত্যাদি কারণে শরীর নাপাক হলে (গোসল ফরজ হলে) কুরআন তিলাওয়াত এবং আবরণহীন ভাবে মুসহাফ (গ্রন্থাকারে লিখিত কুরআন) স্পর্শ করা ব্যতীত সব ধরণের দুআ, তাসবিহ, জিকির-আজকার, ইস্তিগফার, রুকিয়া বা ঝাড়-ফুঁক, হাদিস, ইসলামি বই-পুস্তক ও তাফসির পাঠ ইত্যাদি জায়েজ আছে।
(কেবল তাফসিরের মধ্যে কুরআনের আয়াতগুলো স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকতে হবে)

অনুরূপভাবে হায়েজ-নেফাস জনিত নাপাক অবস্থায়ও উপরোক্ত বিধান প্রযোজ্য হবে। তবে এ অবস্থায় কুরআন স্পর্শ বা তিলাওয়াত করা যাবে কি না তা দ্বিমত পূর্ণ। সঠিক কথা হল, সর্তকতার স্বার্থে একান্ত জরুরি না হলে (যেমন: কুরআন ভুলে যাওয়ার আশঙ্কা, ছাত্রীদের কুরআনের পরীক্ষা ইত্যাদি) কুরআন তিলাওয়াত করা উচিৎ নয়। আর এ অবস্থায় মুসহাফ (গ্রন্থাকারে লিখিত কুরআন) স্পর্শ করার প্রয়োজন হলে, হাতমোজা, কুরআনের গিলাফ, কাপড় বা অন্য কোনও কিছুর আবরণ সহকারে তা স্পর্শ করা যাবে। কিন্তু মোবাইল, ল্যাপটপ ইত্যাদি ডিভাইসে কুরআন থাকলে সে ক্ষেত্রে হাতমোজা বা আবরণ সহকারে ধরা আবশ্যক নয়। কারণ তা মূলত: মুসহাফ নয়।

প্রশ্ন-২: ওজু ব্যতীত হাদিসের কোন বই, তাফসির গ্রন্থ বা যে কোনও ইসলামিক বই-পুস্তক হাতে নিয়ে পড়া যাবে কি?

উত্তর:
ছোট নাপাকি (ওজু না থাকা) অবস্থায় কুরআনের তাফসির, হাদিস, ইসলামি বই-পুস্তক স্পর্শ বা পাঠ করতে কোন অসুবিধা নেই। তবে অধিক বিশুদ্ধ মতে এ অবস্থায় সরাসরি কুরআন স্পর্শ করা যাবে না।কিন্তু মুখস্থ পড়তে দোষ নেই।

অনুরূপভাবে এ অবস্থায় জিকির, দুআ, তাসবিহ, ইস্তিগফার ইত্যাদি পাঠ করতেও কোন সমস্যা নাই।

প্রশ্ন-৩: আমার কোল্ড এলার্জি। এর ফলে প্রায় দিনই আমার হাঁচি-কাশি থাকে, পানি স্পর্শ করলে হাঁচি এবং কানের ব্যথা বেড়ে যায়। এ ক্ষেত্রে আমি কি ওজু ও ফরজ গোসলের পরিবর্তে তায়াম্মুম করতে পারি? আমি খুব দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছি। উত্তর দিলে উপকৃত হব।

উত্তর:
যদি ঠাণ্ডা পানি ব্যবহার করলে আপনি রোগ বৃদ্ধি, আরোগ্য বিলম্বিত হওয়া বা শারীরিক সমস্যার আশঙ্কা করেন তাহলে পানি গরম করে ব্যবহার করবেন। তাতেও সমস্যা হলে পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করবেন। তাহলে তা ওজু এবং ফরজ গোসল উভয় ক্ষেত্রেই পবিত্রতা অর্জনের জন্য যথেষ্ট হবে ইনশাআল্লাহ।

প্রশ্ন-৪: হাতে যদি ফেবিকুইক লেগে যায় তাহলে কি অজু বা গোসল শুদ্ধ হবে?

উত্তর:
শরীরে যদি ফেবিকুইক, সুপার গ্লু, অন্য কোনও আঠা বা এমন বস্তু লাগে যা চামড়ার উপর শক্ত প্রলেপ ফেলে তাহলে তা দূর করা পর্যন্ত ওজু বা গোসল সহিহ হবে না। কেননা এগুলো চামড়ায় পানি পৌঁছুতে বাঁধা দেয়।

তাই ওজু-গোসলের পূর্বে তা যে কোনোভাবে উঠিয়ে ফেলার চেষ্টা করতে হবে। কিন্তু যদি চেষ্টা করার পরও তা ওঠানো সম্ভব না হয় তাহলে সে অবস্থায়ই ওজু বা গোসল সমাপ্ত করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে উক্ত আবরণ পড়া স্থানের উপর দিয়ে পানি বইয়ে দিতে হবে বা ভেজা হাত দিয়ে উক্ত স্থানের উপর হাত মাসেহ করে নিতে হবে। তাহলেই যথেষ্ট হবে ইনশাআল্লাহ। কারণ এটা অপারগ অবস্থা। অপারগ অবস্থায় আল্লাহ তাআলা বান্দার উপর তার সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব চাপিয়ে দেন না। আল্লাহ তাআলা বলেন,
لَا يُكَلِّفُ اللَّـهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا
“আল্লাহ কারো উপর তার সাধ্যাতীত কোন কাজের দায়িত্ব চাপিয়ে দেন না।” [সূরা বাকারা: ২৮৬]
তিনি আরও বলেন,
فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ
“অতএব, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো যতটুকু তোমাদের সাধ্যের মধ্যে থাকে।” [সূরা তাগাবুন: ১৬]

তবে এসব আঠা জাতীয় জিনিস ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে, যেন তা সরাসরি শরীরে না লাগে। তা ছাড়া এটা স্বাস্থ্যের জন্যও ক্ষতিকর।
আল্লাহ তাওফিক দান করুন। আমিন।

প্রশ্ন-৫: দরুদ পড়ার জন্য কি ওজু থাকা জরুরি? নাকি ওজু ছাড়াও পড়া যায়?
উত্তর:
মুমিন ব্যক্তির সর্বদা ওজু ও পাক-পবিত্র অবস্থায় থাকা খুব ভালো। তবে দুআ, দরুদ, তাসবিহ, জিকির-আজকার, ইস্তিগফার, মুখস্থ কুরআন তিলাওয়াত, ইসলামি বই-পুস্তক পাঠ, তাফসির ও হাদিসের কিতাব পাঠ, সেহেরি ও ইফতার খাওয়া, মসজিদে প্রবেশ, সালাম, মুসাফাহা ইত্যাদির জন্য ওজু থাকা জরুরি নয়। ওজু থাকুক বা না থাকুক সর্বাবস্থায় এসব কাজ করা জায়েজ আছে।

তবে সালাত আদায়, (অধিক বিশুদ্ধ মতে) সরাসরি মুসহাফ (কুরআন) হাত দ্বারা স্পর্শ করা, কাবা ঘরের তওয়াফ ইত্যাদির জন্য ওজু থাকা জরুরি।

প্রশ্ন-৬: মল মূত্র ত্যাগের পর ওজু করার ব্যাপারে কি কোনও বাধ্যবাধকতা রয়েছে? অনেকেই বলে, মল ত্যাগের পর ওজু না করে খাদ্য-পানীয় স্পর্শ করা যাবে না। তাহলে কি দিনে যতবার মল মূত্র ত্যাগ করা হবে ততবার ওজু করতে হবে?
উত্তর:
প্রতিবার মল-মূত্র ত্যাগের পরে ওজু করার ব্যাপারে ইসলামে কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। তবে যতবার ওজু নষ্ট হবে ততবার ওজু করা এবং সবসময় পবিত্র অবস্থায় থাকা নিঃসন্দেহে উত্তম।
সে হিসেবে কেউ যদি টয়লেট সারার পরে অজু করে নেয় তবে নিঃসন্দেহে তা উত্তম। তাহলে পাক-পবিত্র অবস্থায় আল্লাহর জিকির করা হবে, ইচ্ছা হলেই নফল সালাত পড়া যাবে এবং সফরে বা মসজিদ থেকে দূরে থাকা অবস্থায় সালাতের সময় হলে যে কোন স্থানে সালাত আদায় করে নেয়া যাবে। কিন্তু সালাতের পূর্বে এবং অধিক বিশুদ্ধ মতে কুরআন সরাসরি হাত দ্বারা স্পর্শ করতে চাইলে ওজু করা আবশ্যক।

প্রশ্ন-৭: ওজু করার মধ্যে যদি কারো পায়ু পথে বাতাস বের হয় তাহলে কি সে ওজু চালিয়ে যাবে নাকি পুনরায় প্রথম থেকে ওজু করবে?
উত্তর:
ওজু চলাকালীন পায়ুপথে বাতাস বের হলে যতটুকু ওজু করা হয়েছিল ততটুকু বাতিল বলে গণ্য হবে। তাই প্রথম থেকে পুনরায় ওজু করা আবশ্যক। এ অবস্থায় প্রথম থেকে ওজু না করে সেভাবেই ওজু শেষ করলে তা বাতিল বলে গণ্য হবে। এ অবস্থায় সালাত আদায় করলে তা সহিহ হবে না।

প্রশ্ন-৮: ওজু করার সময় মাঝখানে ওজু নষ্ট হয়ে গেলে পুনরায় ওজু করতে হবে কি?
উত্তর:
হ্যাঁ, বিসমিল্লাহ বলে পুনরায় প্রথম থেকে ওজু করবেন।

প্রশ্ন-৯: ওজুর শুরুতে “বিসমিল্লাহ না বলে ” বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম ” বলে ওজু করলে কি সহিহ হবে নাকি বিদআত হয়ে যাবে?
উত্তর:
ওজু, পানাহার বা যে কোন কাজের শুরুতে কেবল ‘বিসমিল্লাহ’ (আল্লাহর নামে শুরু করছি) বলাই যথেষ্ট। কেননা হাদিসে কেবল এতটুকুই এসেছে। পুরো “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” পাঠের কথা আসে নি। তাই পুরোটা না বলাই ভালো। কোন কোন আলেম, পুরোটা বলাকে বিদআত বলেছেন। (যেমন: শাইখ আলবানি রাহ.)

যা হোক, কেউ যদি কখনো ভুল বশত: পুরোটা বলেও ফেলে তাহলে তা বিদআত হবে না। তবে ইচ্ছাকৃত ভাবে না বলাই উত্তম। আল্লাহু আলাম।

প্রশ্ন-১০: বিভিন্ন সময় পায়ের আঙ্গুলের অসুখের জন্য ভায়োডিন (গাঢ় নীল রঙ্গের ঔষধ বিশেষ) ব্যবহার করা হয় এবং তা ৭-৮ দিন স্থায়ী থাকে। এতে করে কি ওজুর সমস্যা হবে?
উত্তর:
ওজুর ক্ষেত্রে নিয়ম হল, ওজুর অঙ্গে যদি শক্ত আবরণ বিশিষ্ট এমন কিছু লেগে থাকে যার কারণে চামড়ায় পানি পৌঁছুতে বাঁধাগ্রস্ত হয় তাহলে কেমিক্যাল বা অন্য যে কোনভাবে তা দূর করতে হবে। অন্যথায় ওজু শুদ্ধ হবে না। (চেষ্টা করার পরও সম্ভব না হলে ভিন্ন কথা)। কিন্তু রোগ-ব্যাধির চিকিৎসা হিসেবে যদি শরীরে এমন কিছু লাগানো হয় তাহলে তাতে কোন আপত্তি নাই। বরং উক্ত আবরণের উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত করলে বা ভেজা হাত দ্বারা উক্ত স্থান মাসেহ করলেই যথেষ্ট হবে।

অনুরূপভাবে যদি মেহেদি, সাধারণ রং বা রং জাতীয় ওষুধ (যা চামড়ার উপর আবরণ ফেলে না) লাগানো হয় তাহলে তাতেও ওজুতে কোন সমস্যা নেই। কেননা এতে ওজুর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের চামড়ায় পানি পৌঁছতে বাঁধাগ্রস্ত হয় না।

প্রশ্ন-১১: ওজু করার পর মুখে স্নো অথবা হাত-পায়ে লোশন লাগালে কি ওজু ভঙ্গ হয়?
উত্তর:
না, এতে ওজু ভঙ্গ হবে না। ওজুর পর শরীরে তেল, লোশন, ক্রিম, ভ্যাসলিন, মলম, মেহেদি, রং ইত্যাদি ব্যবহার ওজু ভঙ্গের কোন কারণ নয়।

প্রশ্ন-১২: ওজুর সময় কি মহিলাদের মাথায় ওড়না দেওয়া জরুরি?
উত্তর:
পরপুরুষ দেখার সম্ভাবনা না থাকলে ওজুর সময় মহিলাদের মাথায় ওড়না বা কাপড় দেওয়া আবশ্যক নয়।

প্রশ্ন-১৩: ওজু করে নামাজ শেষে দেখতে পেলাম পায়ের নিচে একটু জায়গায় কালো রঙের ময়লা। অনেকটা চুইংগামের মত। পরে তা টেনে উঠালাম। এখন কি পুনরায় ওজু করে নামাজ পরতে হবে?
উত্তর:
যদি মনে হয় যে, পায়ের তলায় লাগানো বস্তুটি এতটা শক্ত ছিল যে, ওজু করার সময় উক্ত স্থানে পানি পৌঁছেনি তাহলে এতে ওজুও বিশুদ্ধ হয় নি। তাই এ ক্ষেত্রে আপনার করণীয় হল, এখন ওই জিনিসটা উঠিয়ে ফেলে নতুনভাবে ওজু করে পুনরায় সালাত আদায় করা। কারণ ওজু শুদ্ধ না হলে সালাতও শুদ্ধ হবে না।

প্রশ্ন-১৪: শারীরিক সমস্যার কারণে শরীরের কোনও অংশে পানি দিতে না পারলে তাতে ওজু-গোসলের বিধান কি? শুধু উক্ত অংশ না ভিজিয়ে বাকিটা স্বাভাবিক ভাবে ধৌত করলে কি ওজু-গোসল শুদ্ধ হবে?
উত্তর:
ওজু বা গোসলের কোন অঙ্গ পানি দ্বারা ভেজালে যদি ক্ষয়-ক্ষতি বৃদ্ধি পাওয়ার বা ক্ষত শুকাতে বিলম্ব হওয়ার সম্ভাবনা থাকে তাহলে ভেজা হাত দ্বারা সে স্থানটা মাসেহ করে নিবেন। অর্থাৎ হাত ভিজিয়ে তা আহত বা সমস্যা গ্রস্ত স্থানের উপর আলতো করে বুলিয়ে নিবেন। আর বাকি অঙ্গ পানি দ্বারা যথারীতি ধৌত করবেন। তাহলে তাই যথেষ্ট হবে ইনশাআল্লাহ।

প্রশ্ন-১৫: ফরজ গোসলের পর যদি হাঁটুর ওপর এবং নাভির নিচে কাপড় থাকে আর এমতাবস্থায় যদি আমার মা, চাচী, বাবা বা এরকম কেউ দেখে তাহলে কি পুনরায় কি ওজু করতে হবে না কি তাতেই হবে?
উত্তর:
নাভির নিচে কাপড় থাকা অবস্থায় মা, চাচী বা অন্য কেউ দেখলে তাতে ওজুর কোন ক্ষতি হবে না। সুতরাং এতে পুনরায় ওজু করার দরকার নাই। তবে মানুষের সামনে নাভি খোলা রাখা বৈধ নয়। কারণ তা সতরের অন্তর্ভুক্ত।

প্রশ্ন-১৬: এক্সিডেন্টের কারণে হাত-পায়ের চামড়া ছিলে গেছে। এখন ক্ষতস্থানে পানি লাগানো যাবে না। যার কারণে ওজু করা সম্ভব নয়। আশেপাশে মাটিও নেই যে তায়াম্মুম করবো। এখন কি নিয়তের মাধ্যমে ইশারায় ওজু করে সালাত আদায় করা যাবে? না কী করণীয় আছে? কয়েক ওয়াক্ত সালাত মিস হয়ে গেছে। সেগুলা সহ কাজা আদায় করে নেয়া যাবে কি না?
উত্তর:
আল্লাহ আপনাকে দ্রুত সুস্থতা দান করুন। আমিন।
অত:পর, হাত-পা আহত হওয়ার ফলে ক্ষতস্থানে যদি পানি লাগানো সম্ভব না হয় অর্থাৎ এতে আরোগ্য বিলম্বিত হওয়া বা সমস্যা বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা থাকে তাহলে পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করে সালাত আদায় করতে হবে। কিন্তু যদি কোন কারণে পবিত্র মাটিও সংগ্রহ করা সম্ভব না হয় তাহলে ঐ অবস্থায় (ওজু বা তায়াম্মুম ছাড়াই) সালাত আদায় করতে হবে। তাতে ইনশাআল্লাহ পরিপূর্ণ সওয়াব পাওয়া যাবে। পরবর্তীতে উক্ত সালাত পুনরায় কাজা করার প্রয়োজন নাই।
আল্লাহ বলেন, “তোমরা যতটকু সাধ্যে কুলোয় ততটুকু আল্লাহকে ভয় করো।” তিনি আরও বলেন, “আল্লাহ কারো উপর তার সাধ্যাতীত দায়িত্ব চাপিয়ে দেন না।”

ইবনে হাযাম রহ. এই অভিমত ব্যক্ত করেছেন।
قال ابن حزم :
ومن كان محبوساً في حضَرٍ أو سفرٍ بحيث لا يجد تراباً ولا ماءً أو كان مصلوباً وجاءت الصلاة فليصلِّ كما هو وصلاته تامة ولا يعيدها ، سواء وجد الماء في الوقت أو لم يجده إلا بعد الوقت
প্রশ্ন-১৭: বীর্য নির্গত হওয়ার পর অঙ্গ ধৌত করে ওজু ছাড়াই পবিত্র বিছানায় শয়ন করা যাবে কী?
উত্তর:
হ্যাঁ, শোয়া যাবে। তবে বিছানার চাদরে বীর্য লাগলে তা ধৌত করে নেয়া ভালো।

প্রশ্ন-১৮: যাদের প্রস্রাবের খুব সমস্যা আছে-এক রকম অসুখ বলতে পারেন-তারা কাপড় পবিত্র রাখতে পারে না। হাঁচি বা কাশি দিলে কাপড় নষ্ট হয়ে যায়। নামাজের মধ্যেও এই সমস্যা হয়। বার বার অজু করাও কষ্টসাধ্য। তবে তাদের জন্য কী করণীয়? তারা কিভাবে সালাত আদায় করবে?
উত্তর:
ফোটা-ফোটা পেশাব পড়া বা বহুমূত্র রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির জন্য বিধান হল, সে প্রত্যেক ওয়াক্তে ওজু করে নিম্নদেশে আন্ডার ওয়্যার বা কাপড় বেধে সালাত আদায় করবে যেন, পেশাব পা বেয়ে নিচে গড়িয়ে না পড়ে। নামাজরত অবস্থায় হাঁচি বা কাশি দিলে কাপড় নষ্ট হলে বা পেশাব নির্গত হলেও তাতে সালাতে কোনও ক্ষতি হবে না ইনশাআল্লাহ। কেননা সে অসুস্থ (অপারগ)। মহান আল্লাহ বলেন,
اتَّقُوا اللَّـهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ
“তোমরা সাধ্য অনুযায়ী আল্লাহকে ভয় করো।” [সূরা তাগাবুন: ১৬]

তিনি আরও বলেন,
يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلاَّ وُسْعَهَا

“আল্লাহ তা’আলা কারো উপর তার সাধ্যাতীত দায়িত্ব চাপান না।” [সূরা বাকারা: ২৮৬ নং আয়াত]

উল্লেখ্য যে, এ অবস্থায় পেশাব নির্গত হলে বারবার ওজু করার প্রয়োজন নাই বরং কাপড় পরিবর্তন করবে এবং একবার ওজু করে এক ওয়াক্তের পুরো সালাত আদায় করবে। নতুন ওয়াক্ত এলে পুনরায় নতুনভাবে ওজু করে সালাত আদায় করবে। এক ওজুতে একাধিক ওয়াক্তের সালাত আদায় করবে না। তবে এ সমস্যা থেকে মুক্তির জন্য দ্রুত ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন।

আল্লাহই রোগ-ব্যাধি থেকে শিফা দানকারী।

প্রশ্ন-১৯: ওজু করার সময় ভুলে যাই যে, হাত ৩ বার ধৌত করলাম নাকি ২ বার। মুখমণ্ডল ৩ বার ধৌত করলাম না কি ২ বার। এ রকম হলে কি ওজু শুদ্ধ হবে? আর ওই ওজু দ্বারা কি সালাত শুদ্ধ হবে?
উত্তর:
অজুতে যে সকল অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ধৌত করতে হয় সেগুলো পরিপূর্ণভাবে ভিজলেই ওজু শুদ্ধ হবে। সে ক্ষেত্রে পানি নেওয়ার সর্বোচ্চ পরিমাণ হল, তিন বার। কিন্তু একবার অথবা দু বার পানি দ্বারাই যদি ওজুর অঙ্গটি পরিপূর্ণভাবে ভিজে যায় তাহলে তাতেই যথেষ্ট হবে। অনুরূপভাবে হাত-পা ধোয়ার ক্ষেত্রে যদি পানি ব্যবহারের সংখ্যায় কমবেশি হয় অর্থাৎ কোনও অঙ্গে একবার অপরটিতে দু বার বা তিন বার পানি নেওয়া হয় তাহলে তাতেও কোনও সমস্যা নেই।

মোটকথা, ওজুর অঙ্গগুলো পরিপূর্ণভাবে ভেজাতে হবে। তবে তিন বারের বেশি পানি নেওয়া ঠিক নয়।

প্রশ্ন-২০: এক বোনের প্রেগনেন্সির কারণে ঘন ঘন বাথরুমে যেতে হয়। পাশাপাশি বারবার কাপড় নষ্ট করে ফেলে। ফলে তার জন্য প্রতিবার কাপড় চেঞ্জ করাও কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ক্ষেত্রে সে কি প্রতিবার কাপড় পরিবর্তন করবে নাকি ভেতরে কিছু কাপড় নিতে পারে?
উত্তর:
আল্লাহ তাআলা উক্ত বোনের বিষয়টিকে সহজ করে দিন। আমিন।
এই পরিস্থিতিতে বারবার কাপড় পরিবর্তন করার প্রয়োজন নেই। বরং কেবল নামাজের পূর্বে পরিচ্ছন্নতা অর্জন করার পর ভিতরে আন্ডারওয়্যার বা প্যাড পরিধান করবে বা একটি কাপড় বেঁধে নিবে। যেন নাপাকি পা বেয়ে নিচে গড়িয়ে না পড়ে। তারপর পবিত্র কাপড় পড়ে অজু করে সালাত আদায় করবে।

প্রশ্ন-২১ ওজু করার পর কালেমা শাহাদাত এবং একাধিক দুআ আছে যেগুলো পাঠ করায় অনেক ফজিলত রয়েছে! এই দুআগুলো ওজুর স্থানেই বসে পড়া আবশ্যক নাকি ওজু করে ঘরে আসার সময় হাঁটতে হাঁটতে পড়তে পারবো? তা কীভাবে পড়া উত্তম?

উত্তর:
ওজুর পরে পঠিতব্য কালিমা শাহাদাত পাঠ করার হাদিসে ‘ওজুর স্থানে বসে পাঠ করতে হবে’ এমন কোনও কথা বলা হয়নি।

সুতরাং অজু করার পর যথাস্থানে বসে পাঠ করুন অথবা দাঁড়িয়ে বা হাঁটতে হাঁটতে পাঠ করুন তাতে কোন সমস্যা নেই।

ওজু শেষ করার পর পরই তা পাঠ করলে হাদিস অনুযায়ী জান্নাতের আটটি দরজা খুলে দেওয়া হবে। সে তার ইচ্ছা অনুযায়ী যেকোনো দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে ইনশাআল্লাহ-যে অবস্থায়ই তা পাঠ করা হোক না কেন।

ওজুর করার পর সুন্নত হল, ওজু শেষের দুআ পাঠ করা। যেমন: হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি পরিপূর্ণ রূপে ওজু করার পর পাঠ করবে:

أَشْهَدُ أَنْ لاَّ إِلهَ إِلاَّ اللهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيْكَ لَهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ

“আশহাদু আল লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু অহ্‌দাহু লা শারীকা লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আব্দুহু ওয়া রাসূলুহ্‌।” তার জন্য জান্নাতের আটটি দরজা উন্মুক্ত করা হবে সে যে কোনও দরজা দিয়ে ইচ্ছে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে।

দুআটির অর্থ: “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত সত্য কোন উপাস্য নেই। তিনি একক। তাঁর কোন শরিক নেই। আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর বান্দা ও রাসূল।” [সহিহ মুসলিম]

এ ছাড়াও হাদিসে ওজুর পরে পাঠ করার একাধিক দুআ বর্ণিত হয়েছে। সেগুলো থেকে এক বা একাধিক দুআ পাঠ করা যাবে। তা ওজুর স্থানে বসে পাঠ করা হোক অথবা হাঁটতে হাঁটতে পাঠ করা হোক তাতে কোনও আপত্তি নাই ইনশাআল্লাহ।

প্রশ্ন-২২: হাত দ্বারা কুকর ধরলে কিংবা হাত বা কাপড়ে কুকুরের শরীরের স্পর্শ লাগলে কি ওজু নষ্ট হয়ে যাবে?
উত্তর:
এতে ওজু নষ্ট হবে না। কেননা নাপাক বস্তু স্পর্শ করা ওজু ভঙ্গের কারণ নয়।

প্রশ্ন-২৩: অনেক সময় দেখা যায়, মসজিদের ভেতর এবং নিজের রুমের ভেতর টিকটিকির বিষ্ঠা পড়ে থাকে। ওজু অবস্থায় যদি এই বিষ্ঠা পায়ের নিচে বা শরীরে কোথাও স্পর্শ লাগে তাহলে কি ওজু নষ্ট হয়ে যাবে বা বিষ্ঠা পড়া জায়গাটি অপবিত্র হয়ে যাবে?
উত্তর:
টিকটিকি একটি ক্ষতিকারক ও বিষাক্ত প্রাণী। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয় সাল্লাম একে হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছেন [বুখারী ও মুসলিম]। এটি খাওয়া হারাম। কেননা আল্লাহ বলেন, তিনি তাদের জন্য পবিত্র বিষয় সমূহ হালাল করেছেন ও অপবিত্র বিষয় সমূহ নিষিদ্ধ করেছেন’ [আ‘রাফ ৭/১৫৭]
আর ইসলামের মূলনীতি হল, যে প্রাণী খাওয়া হারাম, তার মল-মূত্র নাপাক। অতএব তা কাপড়ে, শরীরে বা মসজিদের মেঝেতে লেগে গেলে তা নাপাক হয়ে যাবে। সুতরাং তা ধৌত করা বা পরিষ্কার করা আবশ্যক।

প্রশ্ন-২৪: বাচ্চাকে বুকের দুধ পান করালে কি ওজু নষ্ট হবে?
উত্তর:
বাচ্চাকে বুকের দুধ পান করালে ওজু নষ্ট হয় না। এটা ওজু ভঙ্গের কোনও কারণ নয়। পেশাব-পায়খানার রাস্তা ছাড়া শরীরের অন্য কোনও স্থান থেকে পবিত্র বস্তু বের হলে ওজু নষ্ট হয় না-এ ব্যাপারে আলেমদের মাঝে কোনও দ্বিমত নাই আল হামদুলিল্লাহ।

প্রশ্ন-২৫: ইমাম যদি বিনা ওজুতে জামাআতে সালাত পড়িয়ে ফেলে তাহলে ইসলামে তার কাফফারা কি?
উত্তর:
ইমাম যদি ভুল বশত: ওজু ছাড়া সালাত আদায় করেন এবং সালাত শেষ হওয়ার পর স্মরণ হয় তাহলে তার গুনাহ হবে না। কারণ সে তা ইচ্ছাকৃত ভাবে করে নি। তবে এ ক্ষেত্রে তার করণীয় হল, তৎক্ষণাৎ ওজু করে নিজে নিজে উক্ত সালাত পড়ে নেওয়া।

কিন্তু ইচ্ছাকৃত ভাবে এমনটি করলে সে গুনাহগার হবে। কারণ ওজু ছাড়া সালাত আদায় করা হারাম। এ ক্ষেত্রে তার করণীয় হল, আল্লাহর কাছে লজ্জিত অন্তরে তওবা করত: ওজু করে নিজে নিজে উক্ত সালাত পড়ে নেওয়া।

কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই মুক্তাদিদের জন্য উক্ত সালাত পুনরায় পড়ার প্রয়োজন নাই। কারণ তারা যথারীতি পবিত্র অবস্থায় সালাত আদায় করেছে। এ ক্ষেত্রে ইমামের ত্রুটি মুসল্লিরা বহন করবে না।

অনুরূপভাবে সালাত রত অবস্থায় যদি ইমামের স্মরণ হয় যে, তার ওজু ছিল না তাহলে তার পেছনের একজন মুক্তাদিকে তার স্থানে স্থলাভিষিক্ত করে ওজু করার জন্য মসজিদ থেকে বের হয়ে যাবে। এতেও মুক্তাদির সালাতের কোনও সমস্যা হবে না।
আল্লাহু আলাম।
▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

Share On Social Media