কোরআন ও সহীহ সুন্নাহ ভিত্তিক প্রশ্নোত্তর প্রচার করাই হল এই ওয়েবসাইটের মূল উদ্দেশ্য।।

এতিম কাকে বলে? এতিমের দেখাশোন ও প্রতিপালনের মর্যাদা এবং এতিমে অর্থ-সম্পদ গ্রাস করার ভয়াবহতা

প্রশ্ন: ইসলামের দৃষ্টিতে এতিম কাকে বলে? যাদের বয়স ১২ বা ১৮ বছর হয়েছে তাদেরকে কি এতিম বলা যায়?
এতিমদের দেখাশোনা ও সম্পদ রক্ষার ব্যাপারে ইসলামে কী বলা হয়েছে?
এ বিষয়গুলো জানা আমাদের খুবই জরুরি। তাই কুরআন-সুন্নাহর আলোকে বিষয়টি জানানোর জন্য অনুরোধ করছি।

উত্তর:

 এতিম কাকে বলে?

 উত্তর: এতিম অর্থ: পিতৃহীন অনাথ শিশু।

ইসলামের দৃষ্টিতেএমন শিশুকে এতিম বলা হয় যার পিতা মারা গেছে। প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়া পর্যন্ত সে এতিম হিসাবে গণ্য হবে। প্রাপ্ত বয়স্ক হবার পর তাকে আর এতিম বলা হবে না।
হানযালা ইবনে হুযাইম আল হানাফী রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
لا يُتْمَ بعد احتلامٍ ، ولا يُتْمَ على جاريةٍ إذا هي حاضَتْ
“স্বপ্নদোষ হলে কোন ছেলে শিশু এতিম থাকে না আর ঋতুস্রাব হলে কোন মেয়ে শিশু এতিম থাকে না।” (সিলসিলা সহীহাহ, পৃষ্ঠা ৩১৮০, আলবানী বলেন إسناده جيد رجاله ثقات)
অর্থাৎ ছেলেদের স্বপ্নদোষ আর মেয়েদের ঋতুস্রাব হওয়ার প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার অন্যতম আলামত। এই আলামত পাওয়া গেলে তাদেরকে ইসলামের দৃষ্টিতে তাদেরকে এতিম বলা যাবে না।

🔰 আমাদের দেশে মেয়েরা সাধারণত: ৯/১০ বছরে আর ছেলেরা ১০/১১ বছরে প্রাপ্ত বয়স্ক হয়ে যায়। তবে ব্যক্তি বিশেষে কমবেশি হতে পারে। প্রাপ্ত বয়ষ্ক হলে তাকে এতিম বলা ঠিক নয়।
🔰 যে শিশুর মা মারা গেছে আর বাবা বেঁচে আছে তাকে ইসলামের দৃষ্টিতে এতিম বলা হয় না।

🔷 এতিমের দায়িত্ব গ্রহণ ও প্রতিপালন করা জান্নাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর খুব কাছাকাছি থাকার একটি বিরাট মাধ্যমা:
সাহল রা. হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
أَنَا وَكَافِلُ الْيَتِيمِ كَهَاتَيْنِ فِي الْجَنَّةِ وَقَرَنَ بَيْنَ أُصْبُعَيْهِ الْوُسْطَى وَالَّتِي تَلِي الْإِبْهَامَ
“আমি ও এতিমের দায়িত্বগ্রহণকারী ব্যক্তি জান্নাতে এই দুই আংগুলির ন্যায় পাশাপাশি অবস্থান করব।” এ কথা বলার পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর মধ্যমা ও বৃদ্ধাঙ্গুগুলিকে কাছাকাছি করে দেখালেন। (সহীহ, সুনান আবু দাউদ)

🔷 এতিম-অনাথ শিশুদের জন্য অর্থ খরচ করা বিশাল মর্যাদপূর্ণ কাজ:
আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَسْأَلُونَكَ مَاذَا يُنفِقُونَ ۖ قُلْ مَا أَنفَقْتُم مِّنْ خَيْرٍ فَلِلْوَالِدَيْنِ وَالْأَقْرَبِينَ وَالْيَتَامَىٰ وَالْمَسَاكِينِ وَابْنِ السَّبِيلِ ۗ وَمَا تَفْعَلُوا مِنْ خَيْرٍ فَإِنَّ اللَّهَ بِهِ عَلِيمٌ
“তারা তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে, তারা কী ব্যয় করবে? বলে দাও, যে বস্তুই তোমরা ব্যয় কর, তা হবে পিতা-মাতার জন্যে, আত্নীয়-আপনজনের জন্যে, এতীম-অনাথদের জন্যে, অসহায়দের জন্যে এবং মুসাফিরদের জন্যে। আর তোমরা যে কোন সৎকাজ করবে, নিঃসন্দেহে তা অত্যন্ত ভালভাবেই আল্লাহর জানা রয়েছে।” (সূরা বাকারা: ২১৫)

🔷 এতিমের সম্পদ গ্রাস করা জাহান্নামে যাওয়ার একটি কারণ:
আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّ الَّذِينَ يَأْكُلُونَ أَمْوَالَ الْيَتَامَىٰ ظُلْمًا إِنَّمَا يَأْكُلُونَ فِي بُطُونِهِمْ نَارًا ۖ وَسَيَصْلَوْنَ سَعِيرًا
“যারা এতীমদের অর্থ-সম্পদ অন্যায়ভাবে খায়, তারা নিজেদের পেটে আগুনই ভর্তি করে এবং অচিরেই তারা জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” (সূরা নিসা: ১০)

🔷 গরিব হলে এতিমের দেখাশোনা ও সম্পদ রক্ষণা-বেক্ষণের পারিশ্রমিক গ্রহণ করা জায়েয:
কারও দায়িত্বে এতিম শিশু থাকলে সে যদি আর্থিকভাবে দুর্বল ও অভাবগ্রস্থ হয় তাহলে তার দেখাশোনা ও সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ করার পারিশ্রমিক হিসেবে তার সম্পদ থেকে যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য পন্থায় কিছু অর্থ গ্রহণ করা জায়েয রয়েছে।
যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَابْتَلُوا الْيَتَامَىٰ حَتَّىٰ إِذَا بَلَغُوا النِّكَاحَ فَإِنْ آنَسْتُم مِّنْهُمْ رُشْدًا فَادْفَعُوا إِلَيْهِمْ أَمْوَالَهُمْ ۖ وَلَا تَأْكُلُوهَا إِسْرَافًا وَبِدَارًا أَن يَكْبَرُوا ۚ وَمَن كَانَ غَنِيًّا فَلْيَسْتَعْفِفْ ۖ وَمَن كَانَ فَقِيرًا فَلْيَأْكُلْ بِالْمَعْرُوفِ ۚ فَإِذَا دَفَعْتُمْ إِلَيْهِمْ أَمْوَالَهُمْ فَأَشْهِدُوا عَلَيْهِمْ ۚ
“আর এতীমদের প্রতি বিশেষভাবে নজর রাখবে, যে পর্যন্ত না তারা বিয়ের বয়সে পৌঁছে। যদি তাদের মধ্যে বুদ্ধি-বিবেচনার উন্মেষ আঁচ করতে পার, তবে তাদের সম্পদ তাদের হাতে অর্পন করো।
এতীমের মাল প্রয়োজনাতিরিক্ত খরচ করো না বা তারা বড় হয়ে যাবে মনে করে তাড়াতাড়ি খেয়ে ফেলো না।
যারা স্বচ্ছল তারা অবশ্যই এতীমের মাল খরচ করা থেকে বিরত থাকবে। আর যে অভাবগ্রস্ত সে সঙ্গত পরিমাণ খেতে পারে। যখন তাদের হাতে তাদের সম্পদ প্রত্যার্পণ কর, তখন সাক্ষী রাখবে।” (সূরা নিসা: ৬)

 মোটকথা, পিতৃহীন এতিম শিশুর দেখাশোনা করা, তার দায়িত্বগ্রহণ করা, তাকে স্নেহমমতা দেয়া, তার প্রতি দয়া করা, তার সম্পদ রক্ষা করা ইত্যাদি ইসলামের দৃষ্টিতে বিশাল মর্যাদাপূর্ণ কাজ এবং জান্নাতে প্রবেশের মাধ্যম। পক্ষান্তরে তার সম্পদ লুটে খাওয়া বা তার প্রতি অন্যায় আচরণ করা খুবাই গর্হিত ও নিন্দনীয় কাজ এবং জাহান্নামে প্রবেশের মাধ্যমে।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এতিম শিশুদের প্রতি যত্নশীল হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমনীন।

উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানী
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ, সৌদি আরব।।

Share This Post