কোরআন ও সহীহ সুন্নাহ ভিত্তিক প্রশ্নোত্তর প্রচার করাই হল এই ওয়েবসাইটের মূল উদ্দেশ্য।।

একদিন নবী মোস্তফায়, রাস্তা দিয়া হাইটা যায়, হরিণ একখান বান্ধা ছিল গাছেরই তলায় এ ঘটনার সত্যতা কতটুকু

প্রশ্ন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও একটি হরিণীর মাঝে কথোপকথন এর একটি ঘটনা খুব প্রসিদ্ধ। তা হল, এক ইহুদী (বা বেদুঈন) একটি হরিণ শিকার করে তার তাঁবুর সাথে বেধে রেখে যায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঐ পথ দিয়ে যাওয়ার সময় হরিণীটি তার কাছে তাকে কিছুক্ষণ সময়ের জন্য মুক্ত করার অনুরোধ করে, যেন সে মরুভূমিতে ফেলে আসা তার বাচ্চাদের দুধ পান করাতে পারে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হরিণীকে প্রশ্ন করেন, তাকে ছেড়ে দিলে সে কি পুনরায় ফিরে আসবে? হরিণী ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি দিলে তিনি তাকে ছেড়ে দেন এবং জামিন হিসেবে নিজে সেখানে অবস্থান করেন। পরে মা হরিণীটি তার বাচ্চাদেরকে সাথে নিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে ফিরে আসে…।
এ দৃশ্য দেখে শিকারি ব্যক্তিটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নবুওয়তের সত্যতা বুঝতে পরে কালিমা পড়ে মুসলিম হয়ে যায়।

এ ঘটনাটির সত্যতা জানতে চাই।

উত্তর:
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও হরিণীর মাঝে কথোপকথন সংক্রান্ত উক্ত ঘটনাটি সাধারণ মানুষের মধ্যে যথেষ্ট প্রসিদ্ধ। আমাদের দেশের ওয়াজ মাহফিলগুলোতে অনেক বক্তা কান্না জড়িত সুরেলা কণ্ঠে এ ঘটনা বয়ান করে থাকেন। মসজিদের মিম্বারে দাঁড়িয়ে কিছু খতিব সাহেব মুসল্লিদেরকে এ সব গল্প শুনিয়ে থাকে। অথচ তারা হাদিসের সত্য-মিথ্যা-সহিহ-যঈফ হওয়ার বিষয়ে মোটেও গবেষণা করে না-যা খুবই দু:খ জনক।

তাছাড়াও রাস্তা-ঘাট, চা ও মুদির দোকান থেকে কানে ভেসে আসে এই গান/গজলের সুর:
“একদিন নবী মোস্তফায়
রাস্তা দিয়া হাইটা যায়
হরিণ একখান বান্ধা ছিল
গাছেরই তলায়।”
মোটকথা, আমাদের দেশের মানুষ প্রচলিত এই কিচ্ছার সাথে বহুকাল থেকে পরিচিত।

যাহোক, এ পর্যায়ে আমরা উক্ত ঘটনটির সনদগত ভিত্তি কতটুকু আছে তা পর্যালোচনা করে দেখবো।

মূলত: এ ঘটনাটি একাধিক হাদিসের কিতাবে বিভিন্নভাবে বর্ণিত হয়েছে। যেমন, আবু নুআইম দালায়েলুন্ন নবুওয়াহ (নবুওয়তের প্রমাণপঞ্জি) গ্রন্থে এ মর্মে একটি লম্বা হাদিস বর্ণনা করেছেন। অনুরূপভাবে সুনানে বায়হাকীতেও এ বর্ণনাটি উল্লেখিত হয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন কিতাবে এটি পাওয়া যায়।

নিম্নে এ হাদিস সম্পর্কে মুহাক্কিক হাদিস বিশারদদের মন্তব্য তুলে ধরা হল:

🌀 আল্লামা মোল্লা আলী ক্বারি রহ. বলেন: “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রশংসায় হরিণীর ঘটনা লোকমুখে ব্যাপক প্রসিদ্ধি রয়েছে। এ ব্যাপারে হাফেয ইবনে কাসীর রহঃ বলেন:
ليس له أصل ومن نسبه إلى النبي صلى الله عليه وسلم فقد كذب
“এ ঘটনার কোনো ভিত্তি নেই। যে এটিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দিকে সম্বন্ধ করল সে মিথ্যা বলল।” (উৎস: আল মাসনু’ ফী মারিফাতিল হাদিসিল মাউযু, পৃষ্ঠা নং ৮০)

🌀 সাখাবী রহঃও প্রায় একই মন্তব্য করেছেন।

🌀 ইবনে হাজার আসকালানী রহঃ বলেন:
أما تسليم الغزالة فلم نجد له إسناداً لا من وجه قوي ولا من وجه ضعيف والله أعلم
“আর হরিণী কর্তৃক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আনুগত্য প্রকাশের ঘটনার ব্যাপারে আমরা শক্তিশালী কিংবা দুর্বল কোনো সনদ (বর্ণনা সূত্র) পাই নি। আল্লাহ ভালো জানেন।” (ফাতহুল বারী ৭/৪০৪)।

🌀 এছাড়াও তিনি এ হাদিসটিকে লিসানুল মীযান গ্রন্থে ‘বাতিল ও বানোয়াট’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। (লিসানুল মীযান, ৬/৩১১)

🌀 হাফেয যাহাবী মীযানুল ইতিদাল গ্রন্থে এটিকে একটি ‘ভ্রান্ত ঘটনা’ হিসেবে ইঙ্গিত দেন। (মিযানুল ইতিদাল ৪/৪৫৬)
أن الحافظ الذهبي ذكره في ميزان الاعتدال وأشار إلى أنه خبر باطل

🌀 শাইখ আলবানী এ হাদিসকে যঈফ (দুর্বল) হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন। তিনি আরও বলেন: এ ঘটনাটি একাধিক সূত্রে বর্ণিত হয়েছে কিন্তু সেগুলোর একটিও সহীহ নয় এবং এক বর্ণনায় যেভাবে ঘটনার বিবরণ এসেছে অন্য বর্ণনায় তা নেই।

মোটকথা, উক্ত ঘটনাটি অধিকাংশ মুহাদ্দিসের মতে বানোয়াট (কারো মতে দুর্বল।) সুতরাং হাদিসের নামে এ জাতীয় কিচ্ছা-কাহিনী বর্ণনা করা বা বিশ্বাস কোনো দায়িত্বশীল মানুষের কাজ হতে পারে না। বক্তা, ইমাম, খতীব ও লেখকদের দায়িত্ব হল, যথাসাধ্য গবেষণা ও যাচায়-বাছায় পূর্বক মানুষের নিকট হাদিস বর্ণনা করা। অন্যথায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নামে মিথ্যাচার করার কারণে জাহান্নামী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে ক্ষমা করুন এবং আমাদেরকে ইসলামের নামে সব ধরণের মিথ্যা-বানোয়াট ও ভিত্তিহীন বিষয়াদি থেকে হেফাজত করুন। আমীন।
والله أعلم بالصواب

▬▬▬💠🌀💠 ▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।।

Share This Post