ঈদের শুভেচ্ছায় ব্যবহৃত বাক্য এবং ঈদ মোবারক বলার বিধান

ঈদের শুভেচ্ছায় ব্যবহৃত বাক্য এবং ঈদ মোবারক বলার বিধান (সংশয় দূর করুন)।
▬▬▬▬◆◈◆▬▬▬▬
উত্তর: মুসলিমদের জাতীয় জীবনে অনাবিল আনন্দের বার্তাবাহী একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হল ঈদ। ঈদ আল্লাহর বড়ত্বের ঘোষণা ও কৃতজ্ঞতার মাধ্যম। মানব জীবনের একঘেয়েমি কাটিয়ে নতুন ভাবে পথ চলার অনুপ্রেরণা। দূরকে কাছে করার এবং সম্পর্কগুলোতে নতুনত্ব দেয়ারে এক চমৎকার সুযোগ। এ ক্ষেত্রে ছোট একটি শুভেচ্ছা বার্তা, একটি বাক্য বা মেসেজই বিরাট ভূমিকা পালন করে। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে এ জন্য কোন বাক্যটি ব্যবহার করা উচিৎ আর কোনটি উচিৎ নয়-এ বিষয়ে আমাদের অনেকেরই মাঝে একটা দ্বিধা বা সংশয় কাজ করে। তাই বিষয়টি পরিষ্কার উদ্দেশ্যে এ সংক্ষিপ্ত আলোচনাটি তুলে ধরা হল:

❒ ঈদের শুভেচ্ছা জানানোর বিধান কি এবং শরিয়তে তা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

ঈদ উৎসব উপলক্ষে মুসলিমদের একে অপরকে শুভেচ্ছা জানানো বৈধ। তবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এ সম্পর্কে নির্দেশনাা মূলক কোন (মারফু) হাদিস আসে নি। বরং সাহাবি ও তাবেঈ প্রমুখ সালাফ (পূর্বসূরীদের) থেকে সহিহ সনদে প্রমাণিত হয়েছে যে, ঈদের দিন একে অপরের সাথে সাক্ষাত হলে তারা বলতেন: “তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম” অর্থ: আল্লাহ আমাদের ও আপনাদের (সৎকর্মগুলো) কবুল করুন। যেমন:
حديث محمد بن زياد ، قال : كنت مع أبي أمامة الباهلي وغيره من أصحاب النبي صلى الله عليه وآله وسلم ، فكانوا إذا رجعوا يقول بعضهم لبعض : ( تقبل الله منا ومنكم ) .
মুহাম্মদ বিন যিয়াদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি আবু উমামা আল বাহেলী রা. এবং অন্যান্য সাহাবিদের সাথে ছিলাম। তারা ঈদ থেকে ফিরে এসে একে অপরকে বলতেন, “তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম।” [ইবনুত তুরকুমানী হাদিসটি ‘আল জাওহারাতুন নাকী হাশিয়াতুল বায়হাকী’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। ইমাম আহমদ বলেন, : إسناده جيد এর সনদ ভালো।

আরও বর্ণিত হয়েছে:
أخرج الأصبهاني في الترغيب والترهيب ( 1/251) عن صفوان بن عمرو السكسكي قال : سمعت عبد الله بن بُسر وعبد الرحمن بن عائذ وجبير بن نفير وخالد بن معدان ، يقال لهم في أيام الأعياد : ( تقبل الله منا ومنكم ) ، ويقولون ذلك لغيرهم . وهذا سند لابأس به .
ইসমাইল বিন মুহাম্মদ ইস্পাহানী (মৃত্যু: ৫৩৫) তার বিখ্যাত ‘তারগিব ওয়াত তারহিব’ গ্রন্থে (১/২৫১) সাফওয়ান বিন আমর আস সিকসিকী থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: আমি আব্দুল্লাহ ইবনে বুসর, আব্দুর রাহমান বিন আয়িয, জুবাইর বিন নুফাইর এবং খালিদ বিন মাদানকে বলতে শুনেছি, তাদেরকে ঈদের দিন বলা হত: “তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম”। আর তারাও অন্যদেরকে তা বলতেন।” এ সনদেও কোন সমস্যা নেই।

সুতরাং ঈদের দিন একে অপরকে এভাবে দুআ ও শুভেচ্ছা জানানো জায়েজ। তবে তা শরিয়তের আবশ্য পালনীয় ও ইবাদতের কোন বিষয় নয়। এটি সওয়াব ও ইবাদতের বিষয় হলে অবশ্যই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার উম্মতকে এ বিষয়ে নির্দেশনা দিয়ে যেতেন। তখন তা পালন করা উম্মতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াত এবং হাদিসে ব্যবহৃত শব্দ ছাড়া অন্য শব্দ ব্যবহারে আপত্তি আসতো। যেমন: মুসলিমদের পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময়ের মাধ্যম সালামের গুরুত্ব এবং সালামে ব্যবহৃত বাক্যাবালী সম্পর্কে বহু সহিহ হাদিস বর্ণিত হয়েছে। সে কারণে সালাম দেয়া যেমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত ও সওয়াবের কাজ তেমনি সালামের জন্য হাদিসের বাক্য বাদ দিয়ে নতুন কোন বাক্য প্রবর্তন করা জায়েজ নয়।

মোটকথা, ঈদ উপলক্ষে শুভেচ্ছা বিনিময় করা ইসলামে জায়েজ হলেও এ ব্যাপারে বিশেষ কোনো নির্দেশনা বা বিশেষ কোন বাক্য ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা আসে নি। তবে কেউ যদি সালাফদের অনুসরণে ‘তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম বলে তাহলে নি:সন্দেহে ভালো।

জ্ঞাতব্য, এ দুআটি কেবল ঈদের সাথেই সম্পৃক্ত নয় বরং হজ্জ, উমরা ইত্যাদি যে কোন নেক আমল করার পর তা বলা জায়েজ।

❒ ‘ঈদ মোবারক’ বা ‘ঈদের শুভেচ্ছা/কনগ্রাচুলেশন’ ইত্যাদি বলা কি বিদআত বা গুনাহের?

আল্লামা ‍মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমীন রহঃ কে প্রশ্ন করা হয়, ঈদের শুভেচ্ছা জানানোর বিধান কি এবং এর জন্য কি বিশেষ কোন বাক্য আছে?
তিনি উত্তরে বলেন,
التهنئة بالعيد جائزة ، وليس لها تهنئة مخصوصة ، بل ما اعتاده الناس فهو جائز ما لم يكن إثماً
“ঈদের শুভেচ্ছা জানানো জায়েজ। তবে এর জন্য বিশেষ কোন শুভেচ্ছা বাক্য নেই। বরং মানুষ যে সব বাক্য বলে অভ্যস্ত সেগুলো ব্যবহার করা জায়েজ যদি তাতে গুনাহ না থাকে।”

তিনি আরও বলেন,

“সালাফদের থেকে বর্ণিত হয়েছে, ঈদের দিন একে অপরের সাথে দেখা হলে তারা বলতেন, ‘তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম’ কিন্তু শরিয়তে এ বিষয়ে বিশেষ কোনও বাক্য নির্ধারণ করে দেওয়া হয়নি। অতএব লোকসমাজে যে সকল বাক্য ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে সেগুলো যদি শরিয়তে নিষিদ্ধ না হয়ে থাকে তবে সেগুলো ব্যবহার করা জায়েজ। কেননা শুভেচ্ছা জানানোর বিষয়টি মানুষের রীতি-নীতির সাথে সম্পৃক্ত। এটা শরিয়তের কোন বিষয় নয়। বরং তা রীতিনীতি ও আভ্যাসগত বিষয়ের অন্তর্গত যা মানুষ নিজেদের মধ্যে প্রচলন করে নিয়েছে।
সুতরাং মানুষ যদি ‘তাকাব্বালাল্লাহ’ অথবা ‘দুআ করি আল্লাহ তোমার ঈদকে বরকত মণ্ডিত করুন’ বা এ জাতীয় বাক্য ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়-যেগুলো বললে পারস্পারিক ভালবাসা বৃদ্ধি পায় এবং নিজেদের মাঝে দূরত্ব দূর হয় তাহলে তাতে কোন সমস্যা নেই। কারণ এগুলো সাধারণ রীতিনীতির বিষয়।” (শাইখের লেকচার থেকে অনুদিত। উৎস: ইউটিউব চ্যানেল আল ওয়াহদাহ আল ইসলামিয়া আল ঊলা)

এছাড়াও আল্লামা আব্দুল্লাহ বিন বায রহ. সহ বড় আলেমগণ ঈদ মোবারক (ঈদ বরকতময় হোক) বা এ জাতীয় বাক্য ব্যবহার করে ঈদের শুভেচ্ছা জানাতে কোন আপত্তি করে নি।

পরিশেষে বলব, ঈদের শুভেচ্ছা ও দুআ সম্বলিত বাক্য ‘তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম’ (আল্লাহ আামদেরও আপনাদের সৎকর্মগুলো কবুল করুন) ব্যবহার করা নি:সন্দেহে উত্তম। কিন্তু ‘ঈদ মোবারক’ (বরকতময় ঈদ), ‘ঈদের শুভেচ্ছা’, ‘কনগ্রাচুলেশন’, বা এ জাতীয় শব্দ/বাক্য ব্যবহার করায় কোন দোষ নেই-যতক্ষণ না তাতে শরিয়াপরিন্থী বা খারাপ অর্থবোধক কিছু থাকে। এ সব বাক্য ব্যবহার করাকে বিদআত, শরিয়া বিরোধী..গুনাহের বিষয় ইত্যাদি বলা হল দ্বীনের মধ্যে বাড়াবাড়ির শামিল ও অজ্ঞতার প্রমাণ।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে দীনের সঠিক জ্ঞান দান করুন এবং বাড়াবাড়ি থেকে রক্ষা করুন। আমীন। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬◆◈◆▬▬▬▬
লেখক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।