ইসলামি বই অনুবাদ বা রচনা ও প্রকাশ এবং কিছু লোকের আচরণ

ইসলাম সম্পর্কে যত কিতাব-পুস্তক লিখা হয়েছে, তা সবই আরবি ভাষায়। তারপর মানুষের চাহিদার কারণে এবং ইসলামের প্রচারের স্বার্থে অনেক কিতাব বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করে প্রকাশ করা হয়েছে। খুবই ভালো আমল। কেননা এর মাধ্যমে ইলমের প্রচার ও প্রসার হয়। অনভিজ্ঞ লোকদের কাছে তাদের নিজের ভাষায় ইলমও ইসলাম পৌঁছে যায়, ফলে তারা উপকৃত হয়। কিন্তু কিছু লোকের আচরণ দেখলে আপনি আশ্চর্য হবেন। তাদের মধ্যে বই লিখা/অনুবাদের ব্যাপারে ইলমি আমনতদারিতা লক্ষ্য করা যায় না।

মূল লেখকের একটি বই হাতে নিয়ে:

◍ তার মধ্যে থেকে এদিক-ওদিক থেকে দু/চার পৃষ্ঠা বাদ দেয়,
◍ বাক্যগুলোকে একটু কাট-ছাট করে সংক্ষিপ্ত করে,
◍ বইয়ের শিরোনাম পাল্টিয়ে অনুবাদ করে নিজের লেখা বই প্রকাশ করার কোশেস করে।
◍ অনেক সময় নিজের রচিত বইয়ে বা অনুবাদকৃত বইয়ে অন্য লেখকের কথা সংকলন করে, কিন্তু কোন রেফারেন্স দেয় না।
বইয়ের প্রথম পাতায় নজর বুলিয়ে লেখকের নাম দেখে পাঠক ভাববে মা-শা আল্লাহ লেখক কত কষ্ট আর পরিশ্রম করে বইটি প্রস্তুত করেছেন। অথচ বইয়ের মা’লুমাত (বিষয়গুলো) অধিকাংশ ক্ষেত্রে তার নিজের সংকলন থেকে নয়। এটা অন্য মানুষের প্ররিশ্রমের ফল।
◍ আরো আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, এমনকি ভূমিকা বা উপসংহারেও ঐ সমস্ত লেখদের শ্রমের কোন প্রকার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয় না বা কোন ইঙ্গিতও দেয়া হয় না।
◍ অনেকে ফেসবুক বা বিভিন্ন ওয়েব সাইট থেকে বিভিন্ন জনের লেখা প্রবন্ধ ইত্যাদি কপি করে নিজের নামে প্রকাশ করে; অথচ মূল লেখকের কোন কৃতজ্ঞতা করে না।

ইলম প্রচারের এই চরিত্রকে আধুনিক একাডেমিক পুস্তক প্রকাশের ভাষায় বা উলামাদের পরিভাষায় ‘চুরি’ বলা হয় বা আমানতের মধ্যে ত্রুটি বলা হয়। উলামাগণ এ ধরণের ইলমে কোন বরকত থাকে না বলে মত প্রকাশ করেছেন। অবশ্যই এরূপ কাজ উচ্চ আদব-শিষ্টাচারের পরিপন্থী এতে কোন সন্দেহ নেই।
ইমাম সুয়ূতী বলেন, من بركة العلم وشكره عزْوُه إلى قائله “ইলমের বরকত এবং শুকরিয়া তখন হবে, যখন এটা কোথা থেকে সংকলন করা হয়েছে, তার উৎস পেশ করা হবে।”

তিনি আরো বলেন, আব্বাস বিন মুহাম্মাদ আদ দূরী বলেন, আমি আবু উবাইদকে একথা বলতে শুনেছি, “ইলমের শুকরিয়া করা উচিত। তুমি যখন কারো নিকট থেকে উপকৃত হবে তখন বলবে, আমি এটা জানতাম না। এটা আমার জ্ঞানে ছিল না। এ বিষয়ে উমুক ব্যক্তি বা উমুক কিতাব থেকে এই এই ফায়েদা লাভ করেছি.. এটা হচ্ছে ইলমের শুকরিয়া।” [আল মুযাহহার ২/২৭৩, মাকতাবা শামেলা] এ ধরণের নিন্দনীয় কাজের ক্ষেত্রে ইমাম আলবানি রহ. নিম্নোক্ত হাদিসটি পেশ করে থাকেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
الْمُتَشَبِّعُ بِمَا لَمْ يُعْطَ كَلَابِسِ ثَوْبَيْ زُورٍ
“মানুষ যে বস্তুর মালিক নয়, তা নিজের বলে প্রকাশ করা, দুটি মিথ্যার চাদর পরিধানকারীর ন্যায়।” (বুখারী ও মুসলিম) [দ্রষ্টব্য: আল কালেমুত তাইয়্যেব- ইবনে তায়মিয়া, তাহকীক আলবানী ভূমিকা, পৃ: ১১]

উলামাগণ অন্য লেখকদের বক্তব্য নকল করাকে নিন্দা করেন নি; নকল করার সময় বক্তব্যটি লেখকের দিকে নেসবত (সম্বন্ধ) না করাটাকে তিনি নিন্দা করেছেন।

বিশেষভাবে আল্লামা নাসেরুদ্দিন আলবানি রহ. বক্তব্য উদ্ধৃত করে তা লেখকের দিকে নেসবত (সম্বন্ধ) না করার বিষয়টিকে কঠিনভাবে সমালোচনা করেছেন। [তাহকীক আল কালেমুত তাইয়্যেব, ইবনে তাইমিয়া বইয়ের তাহকীকের ভূমিকা [তিনি বলেন, ইলমের আমনত হচ্ছে, প্রত্যেকটি বক্তব্যকে মূল লেখকের দিকে নেসবত (সম্বন্ধ) করা। [সহীহ আবু দাউদ, ১/২২১]
————–
লেখক: শাইখ আব্দুল্লাহ আল কাফী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
সম্পাদক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।

Share On Social Media