সালাতে অলসতা দূর করার ১৩ উপায়

প্রশ্ন: ইদানীং নামাজ পড়ার ব্যাপারে মনের মধ্যে খুব অলসতা অনুভব করি। নামাজ পড়ি ঠিকই কিন্তু শুধু মনে হয় সবে তো আযান হল, কিছু সময় পরে পড়ব। আবার একটু পরে মনে হয় এখন আর পড়ব না কাজা নামাজ আদায় করে নিব। কি করে এই সমস্যার সমাধান করতে পারি?

উত্তর:

এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, কালিমার পরে সালাতের মত এত গুরুত্ব ও মর্যাদাপূর্ণ ইবাদত আর কিছু নেই। এটি সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ইবাদত। সালাত পরিত্যাগ করা কুফুরি পর্যায়ের গুনাহ। এ ব্যাপারে কুরআন-হাদিসে এত বেশি আলোচনা ও তাগিদ এসে যে, অন্য কোনো বিষয়ে এতটা আসে নি।

কিন্তু বাস্তব কথা হল, একমাত্র আল্লাহ ভীরুদের জন্য ছাড়া পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করা খুবই কঠিন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَاسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ ۚ وَإِنَّهَا لَكَبِيرَةٌ إِلَّا عَلَى الْخَاشِعِينَ
“ধৈর্য্যের সাথে সাহায্য প্রার্থনা কর নামাযের মাধ্যমে। অবশ্য তা যথেষ্ট কঠিন। কিন্তু আল্লাহ ভীরু লোকদের পক্ষেই তা সম্ভব।“ (সূরা বাকারা: ৪৫)

এ পর্যায়ে আমরা সালাতে অলসতা ও অবহেলা প্রদর্শনের কঠিন পরিণতির কথা জানবো।

১. সালাতে অলসতা ও অবহেলা প্রদর্শনকারীর পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ:
যেমন: আল্লাহ তাআলা বলেন:
فَوَيْلٌ لِّلْمُصَلِّيْنَ، الَّذِيْنَ هُمْ عَنْ صَلاَتِهِمْ ساَهُوْنَ
“ঐ সকল নামাযীদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি (অথবা জাহান্নামের মধ্যে ওয়াইল নামক একটি আগুনের উপত্যকা) যারা সালাত থেকে উদাসীন।” (সূরা মাঊন ৪ ও ৫)
এ আয়াতের তাফসীরে সা‘দ বিন আবী ওয়াক্কাস রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে জিজ্ঞেস করা হল, তারা কারা যাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি? তিনি বললেন, “যারা সালাতের নির্দিষ্ট সময় পার করে দিয়ে সালাত আদায় করে।”
২) নামাযে অলসতা করা মুনাফিকের বৈশিষ্ট্য:
মহীয়ান আল্লাহ বলেন:
إنَّ الْمُناَفِقِيْن يُخاَدِعُوْنَ اللهَ وَهُوَ خاَدِعُهُمْ، وإذاَ قاَمُوْا إلَى الصَََلاَةِ قاَمُوْا كُسَالَى يُراَؤُونَ الناَّسَ وَلاَ يَذْكُرُوْنَ اللهَ إلاَّ قَلِيْلاً
“অবশ্যই মুনাফেকরা প্রতারণা করছে আল্লাহর সাথে অথচ তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতারিত করে। বস্তুত: তারা যখন নামাযে দাঁড়ায় তখন দাঁড়ায় অলস ভঙ্গিতে লোক দেখানোর জন্য। আর তারা আল্লাহকে অল্পই স্মরণ করে।” (সূরা নিসা: ১৪২)

৩) আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
لَيْسَ صَلاَةٌ أثْقَلَ عَلىَ الْمُناَفِقِيْنَ مِنْ صَلاَةِ الْفَجْرِ وَالعِشاَءِ وَلَوْ يَعْلَمُوْنَ ماَ فِيْهِماَ لأَتَوْهُماَ وَلَوْ حَبْواً
“মুনাফিকদের উপর ইশা ও ফজর সালাতের চাইতে এমন কষ্টকর কোনো সালাত নেই। তারা যদি জানতো যে, এ দু সালাতে কি প্রতিদান রয়েছে তবে হামাগুড়ি দিয়ে ( বা নিতম্বের উপর ভর করে) হলেও তাতে উপস্থিত হত।” (বুখারী ও মুসলিম)

৪) ইচ্ছাকৃত ভাবে দেরী করে সালাত আদায়কারীকেও হাদিসে মুনাফিক বলা হয়েছে।

আনাস বিন মালিক রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি শুনেছি রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:

“ঐ টা মুনাফেকদের সালাত.. ঐটা মুনাফেকদের সালাত..ঐ টা মুনাফেকদের সালাত- যে ইচ্ছাকৃত ভাবে বসে থাকে। তারপর সূর্য (অস্ত যাওয়ার পূর্বে) যখন তা হলুদ বর্ণ ধারণ করে এবং শয়তানের দু শিংয়ের মাঝে অবস্থান করে তখন সে চারটি ঠোকর মারে আর তাড়াহুড়ার কারণে তাতে খুব অল্পই আল্লাহ্‌কে স্মরণ করে থাকে।” (আহমাদ, আবু দাঊদ, মালিক)
৫. সময়মত সালাত আদায় করা অন্যতম শ্রেষ্ঠ আমল:
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে:
أَىُّ الْعَمَلِ أَحَبُّ إِلَى اللَّهِ قَالَ ‏”‏ الصَّلاَةُ عَلَى وَقْتِهَا ‏”‏‏.‏ قَالَ ثُمَّ أَىُّ قَالَ ‏”‏ ثُمَّ بِرُّ الْوَالِدَيْنِ ‏”‏‏.‏ قَالَ ثُمَّ أَىّ قَالَ ‏”‏ الْجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ
আবদুল্লাহ (ইবনে মাসউদ) রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞাসা করলাম, আল্লাহর নিকট কোন আমল সবচেয়ে বেশী পছন্দনীয়? তিনি বললেন:
সময় মত সালাত আদায় করা।
(আবদুল্লাহ) জিজ্ঞাসা করলেন: তারপর কোনটি?
তিনি বললেন: পিতা মাতার সঙ্গে উত্তম ব্যবহার করা।
আবদুল্লাহ জিজ্ঞাসা করলেন: তারপর কোনটি?
তিনি বললেন: আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা।
আবদুল্লাহ বলেন: নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এগুলো সম্পর্কে আমাকে বলেছেন। আমি যদি তাকে আরও বেশী প্রশ্ন করতাম, তিনি আমাকে অধিক জানাতেন।

এ সকল আয়াত ও হাদিস থেকে যথাসময়ে সালাত আদায় করার গুরুত্ব এবং তা আদায়ের ক্ষেত্রে অলসতা ও ঢিলেমী করার ভয়াবহতা সুষ্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়।

নিম্ন সালাত আদায়ে অলসতা দূর করার ১৩টি উপায় পেশ করা হল:

১. যথাসময়ে সালাত আদায়ের গুরুত্ব ও মর্যাদার কথা স্মরণ করা।
২. সালাতে অবহেলা বা অলসতা প্রদর্শনের ভয়াবহতার কথা মনে জাগ্রত করা।
এ দুটি বিষয়ে কুরআনের আয়াত ও হাদিস সম্বলিত ভালো মানের বই বা আর্টিকেল পাঠ করা উচিৎ বা এ বিষয়ে ভালো মানের লেকচার শোনা উচিৎ। জানা থাকলেও আবারও পড়তে পারেন বা আবারও ভিডিও লেকচার শুনতে পারেন। এতে মনের মধ্যে নতুনভাবে অনুপ্রেরণা আসবে।

৩. মনে মৃত্যুর কথা জাগ্রত রাখা যে, যে কোনো সময় আমার মৃত্যু ঘটতে পারে। সুতরাং সময় হওয়ার পরও যদি সালাত আদায়ে বিলম্ব করি আর ইতোমধ্যে যদি আমার মৃত্যু সংঘটিত হয় তাহলে অলসতা বশত: কাযা সালাতের দায়ভার মাথায় নিয়ে আল্লাহর কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।

৪. অলসতা দূর করার জন্য আল্লাহ নিকট দুআ করা। বিশেষ ভাবে এই দুআটি পাঠ করা:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ الْعَجْزِ وَالْكَسَلِ وَالْجُبْنِ وَالْهَرَمِ وَالْبُخْلِ وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ وَمِنْ فِتْنَةِ الْمَحْيَا وَالْمَمَاتِ
“হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট আশ্রয় চাই অক্ষমতা, অলসতা, অক্ষমতা, বার্ধক্য ও কৃপণতা থেকে। আরও আশ্রয় চাই কবরের আযাব ও জীবন-মরণের ফিতনা থেকে।” [বুখারী ৬৩৬৭ ও মুসলিম ২৭০৬]

৫. যথাসময়ে সালাত আদায়ের জন্য দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেয়া এবং তা বাস্তবায়নে আল্লাহর নিকট সাহায্য চাওয়া।
কেউ যদি ভালো কাজ করার দৃঢ় অঙ্গীকার করে এবং আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করে তাহলে আল্লাহ তাআলা তাকে অবশ্যই সাহায্য করেন।

৬. আল্লাহর নিকট খাঁটি অন্তরে তওবা করা এবং পাপকর্ম পরিত্যাগ করা। কারণ পাপের সাথে জড়িত থাকার ফলে অন্তরে প্রলেপ পড়ে যায়। তখন সে ধীরে ধীরে আল্লাহর রাস্তা থেকে দূরে সরে যায়। সে আর আগের মত ইবাদতে সাধ অনুভব করে না। যার কারণে অন্তরে ইবাদতে আড়ষ্টতা, অবহেলা ভাব ও অলসতা অনুভব করে।

৭. সালাতে বিলম্ব হলে নিজেকে ধিক্কার দিন এবং ভবিষ্যতে যেন আর এমনটি না হয় সে জন্য মনকে প্রস্তুত করুন।

৮. সবসময় ওযু অবস্থায় থাকার চেষ্টা করুন। ওযু ভেঙ্গে গেলে পূণরায় ওযু করে নিন। তাহলে এটি সময় হওয়ার সাথে সাথে সালাত আদায়ের ক্ষেত্রে সহায়ক হবে ইনশাআল্লাহ।

৯. আপনার দৈনন্দিন কিছু কাজ নামাযের উপর ভিত্তি করে সাজিয়ে নিন। যেমন: এ কাজটি নামাযে আগে করবেন আর এ কাজটি নামাযের পরে করবেন…এভাবে।

১০. মনকে সময় মত নামায পড়তে বাধ্য করুন। কারণ আমরা যদি মন মত চলি তাহলে আমরা সর্বক্ষেত্রে ব্যর্থ হবো। তাই মনকে কখনো কখনো কাজে বাধ্য করতে হয়। অর্থাৎ ইচ্ছা না থাকলেও করতে হয়।

সুতরাং আপনি যদি কিছুদিন মনের মধ্যে অলসতাতে প্রশ্রয় না দিয়ে মনকে সঠিক সময়ে সালাত আদায় করতে বাধ্য করেন তাহলে অল্প দিন পরই এর ফলাফল পাওয়া শুরু করবেন। তখন মনের মধ্যে অলসতা আশ্রয় পাবে না ইনশাআল্লাহ।

১১. আরেকটি বিষয় বলব, অনেক মানুষ অজ্ঞতা বশত: পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের আগে-পরে মিলিয়ে এত বেশি পরিমাণ রাকআত সংখ্যায় পড়ে যা হয়ত অনেকের জন্য নামায পড়ার ব্যাপারে মনে বিতৃষ্ণা সৃষ্টি করে। এ কারণে মনের অজান্তে অলসতা ও অবহেলা চলে আসে। যেমন: অনেকে ইশার সালাত পড়ে সতেরো রাকআত! অথচ হাদিসে এত রাকআত পড়ার কথা আসে নি।

সুতরাং কোন ওয়াক্তে কত রাকআত পড়তে হয় সেটা ভালো করে জেনে নিন।

আর এটাও মনে রাখা প্রয়োজন যে, যদি কখনো কোনা কারণে নামাযের প্রতি মনে আগ্রহ না থাকে বা অলসতা অনুভব হয় তাহলে কমপক্ষে কেবল ফরযটুকু পড়ে নিন। সুন্নতগুলো বাদ দিন। যদি মাঝে মধ্যে সুন্নত নামাযগুলো ছেড়ে দেয়া হয় তাহলে গুনাহ হবে না। তবে সুন্নত নামায ছাড়াকে নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত করা উচিৎ নয়।

১২. যে বিষয়গুলো অলসতা তৈরি করে সেগুলো থেকে দূরে থাকুন। বর্তমানে অলস সময়গুলোর সঙ্গী হয়ে থাকে সোশ্যাল মিডিয়া, স্মার্ট ফোন, ল্যাপটপ বা টেলিভিশন। এসব থেকে কিছু সময়ের জন্য হলেও দূরে থাকতে হবে। তাহলে কাজে মন বসবে, ইবাদতে আগ্রহ সৃষ্টি হবে এবং অলসতাও হার মানবে।

১৩. অতিরিক্ত ঘুম ও খাওয়া মনকে অলস এবং শরীরকে স্থূল করে দেয়। সুতরাং এ দুটি বিষয় যেন অতিরিক্ত না হয় সে দিকে সতর্ক হতে হবে। বরং পরিমিত খাওয়া ও পরিমিত ঘুম, হালকা ব্যায়াম বা শারীরিক পরিশ্রমের অভ্যাস মানুষকে সচল রাখে এবং অলসতা ও স্থবিরতা দুর করে।

পরিশেষ কবির ভাষায় বলব,

“অলস অবোধ যারা
কিছুই পারে না তারা
তোমায় তো দেখি নাকো
তাদের আকার।”
অলসতা যেমন আমাদের পার্থিব জীবনে সাফল্য ও উন্নতির পথে বাধা তেমনি আখিরাতের মুক্তির জন্য বিরাট প্রতিবন্ধক।
সুতরাং অন্তরে প্রাণ চাঞ্চল্য বজায় রাখুন। অলসতাকে না বলুন এবং সময়ের কাজ সময়ে করুন। তাহলে ইনশাআল্লাহ এক দিকে যেমন দুনিয়ায় সুখী জীবন অর্জন করা সম্ভব হবে অন্যদিকে আল্লাহ চাইলে আখিরাতেও অর্জন করা সম্ভব হবে অনন্ত সুখ-সমৃদ্ধ চিরসুখের নীড় জান্নাত। আল্লাহ কবুল করুন। আমীন।
▬▬▬🌐💠🌐▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।।