কোরআন ও সহীহ সুন্নাহ ভিত্তিক প্রশ্নোত্তর প্রচার করাই হল এই ওয়েবসাইটের মূল উদ্দেশ্য।।

শ্রীলংকায় বোমা হামলা: ইসলামের দৃষ্টিতে এক নিকৃষ্ট অপরাধ

প্রশ্ন: শ্রীলংকায় সম্প্রতি বোমা হামলায় খ্রিস্টান সহ বহু লোককে তাদের উপাসনালয়ে হত্যা করা হয়েছে। এ ব্যাপারে ইসলাম কী বলে?

উত্তর:

২১ এপ্রিল ২০১৯ তারিখে শ্রীলংকায় খ্রিস্টানদের গির্জা, হোটেল এবং অন্যান্য একাধিক স্থানে ধারাবাহিক বোমা হামলার মাধ্যমে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে। এতে হতাহত হয়েছে পুরুষ, নারী, বৃদ্ধ, শিশু নির্বিশেষে বহু সংখ্যক মানুষ। এটি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত দু:খজনক, ন্যক্কারজনক ও জঘন্য অপরাধ। ইসলাম কখনো এ ধরণের কা পুরুষোচিত হত্যাযজ্ঞ, রক্তপাত ও ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম কে সমর্থন করে না।

নিম্নে এ সম্পর্কে কুরআন-হাদিসের আলোকে ইসলামের দৃষ্টাভঙ্গি তুলে ধরা হল:

ইসলামে খোদ যুদ্ধ অবস্থায়ও শিশু, বৃদ্ধ, গীর্জায় উপাসনারত লোক সহ নিরাপরাধ মানুষ হত্যা করা করা বা তাদের কোনোরূপ ক্ষতি করা নিষিদ্ধ:

নিম্নে এ সংক্রান্ত কুরআনের আয়াত, হাদিস ও সাহাবীদের উক্তি পেশ করা হল:

➤ ১) আল্লাহ তাআলা বলেন:

لَّا يَنۡهَىٰكُمُ ٱللَّهُ عَنِ ٱلَّذِينَ لَمۡ يُقَٰتِلُوكُمۡ فِي ٱلدِّينِ وَلَمۡ يُخۡرِجُوكُم مِّن دِيَٰرِكُمۡ أَن تَبَرُّوهُمۡ وَتُقۡسِطُوٓاْ إِلَيۡهِمۡۚ إِنَّ ٱللَّهَ يُحِبُّ ٱلۡمُقۡسِطِينَ
“আল্লাহ নিষেধ করেন না ওই লোকদের সঙ্গে সদাচার ও ইনসাফ পূর্ণ ব্যবহার করতে যারা তোমাদের সঙ্গে দীনের বিষয়ে যুদ্ধ করে নি এবং তোমাদের আবাসভূমি হতে তোমাদের বের করে দেয় নি। নিশ্চয় আল্লাহ ইনসাফকারীদের পছন্দ করেন।” (সূরা আল মুমতাহিনা: ৮)

➤ ২) মু’তার যুদ্ধে রওনার প্রাক্কালে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বাহিনীকে নির্দেশ দেন :
« وَلاَ تَقْتُلُوا امْرَأَةً وَلاَ صَغِيرًا ضَرَعًا وَلاَ كَبِيرًا فَانِيًا وَلاَ تَقْطَعُنَّ شَجَرَةً وَلاَ تَعْقِرُنَّ نَخْلاً وَلاَ تَهْدِمُوا بَيْتًا ».
● “তোমরা কোনো নারীকে হত্যা করবে না
● অসহায় কোনো শিশুকে হত্যা করবে না।
● কোনো অক্ষম বৃদ্ধকে হত্যা করবে না।
● কোনো গাছ উপড়াবে না।
● কোনো খেজুর গাছ জ্বালিয়ে দেবে না।
● আর কোনো গৃহও ধ্বংস করবে না।” [মুসলিম : ১৭৩১]

➤৩) অন্য হাদিসে বর্ণিত হয়েছে:

عَنْ عَلْقَمَةَ بْنِ مَرْثَدٍ، عَنْ سُلَيْمَانَ بْنِ بُرَيْدَةَ، عَنْ أَبِيهِ، أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏ “‏ اغْزُوا بِاسْمِ اللَّهِ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَقَاتِلُوا مَنْ كَفَرَ بِاللَّهِ اغْزُوا وَلاَ تَغْدِرُوا وَلاَ تَغُلُّوا وَلاَ تُمَثِّلُوا وَلاَ تَقْتُلُوا وَلِيدًا ‏”‏ ‏.‏

সুলাইমান ইবনু বুরাইদাহ (রহঃ) হতে তার পিতা থেকে বর্ণিতঃ নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ

● তোমারা আল্লাহর নাম নিয়ে আল্লাহর পথে যুদ্ধ করো। যারা আল্লাহর পথে কুফরী করেছে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো।
● তোমারা যুদ্ধ করে যাও কিন্তু বিশ্বাসঘাতকতা করো না,
● ওয়াদা ভঙ্গ করো না,
● গনীমাতের মাল (যুদ্ধলদ্ধ সম্পদ) আত্মসাৎ করো না,
● লাশ বিকৃত করো না
● এবং শিশুদের হত্যা করো না। “
সুনানে আবু দাউদ, অধ্যায়: জিহাদ অনুচ্ছেদ-৯০
মুশরিকদেরকে ইসলামের দাওয়াত প্রদান, সনদ সহিহ

➤ ৪) আবু বকর সিদ্দীক রা. সিরিয়ায় এক সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করেছিলেন। উক্ত বাহিনীর এক-চতুর্থাংশের অধিনায়ক ছিলেন ইয়াজিদ ইবনে আবু সুফিয়ান রা.। বিদায়ের সময় তিনি তাঁর সঙ্গে কিছুদূর পায়ে হেঁটে যান।

এসময় তিনি তাকে যুদ্ধ সংক্রান্ত কতিপয় নির্দেশনা প্রদান করেন। তন্মধ্যে একটি উপদেশ হল:

إِنَّكَ سَتَجِدُ قَوْمًا زَعَمُوا أَنَّهُمْ حَبَّسُوا أَنْفُسَهُمْ لِلَّهِ فَذَرْهُمْ وَمَا زَعَمُوا أَنَّهُمْ حَبَّسُوا أَنْفُسَهُمْ لَهُ
“সেখানে কিছু এমন ধরণের লোক তুমি দেখবে যারা নিজেদেরকে আল্লাহর ধ্যানে নিবেদিত বলে মনে করে (অর্থাৎ খৃস্টান পাদ্রী)। তাদেরকে তাদের অবস্থায় ছেড়ে দিও।”

➤ ৫) এছাড়াও তিনি তাকে অন্যান্য দশটি নির্দেশনা প্রদান করেন। তিনি বলেন:
وَإِنِّي مُوصِيكَ بِعَشْرٍ لَا تَقْتُلَنَّ امْرَأَةً وَلَا صَبِيًّا وَلَا كَبِيرًا هَرِمًا وَلَا تَقْطَعَنَّ شَجَرًا مُثْمِرًا وَلَا تُخَرِّبَنَّ عَامِرًا وَلَا تَعْقِرَنَّ شَاةً وَلَا بَعِيرًا إِلَّا لِمَأْكَلَةٍ وَلَا تَحْرِقَنَّ نَحْلًا وَلَا تُغَرِّقَنَّهُ وَلَا تَغْلُلْ وَلَا تَجْبُنْ.
“দশটি বিষয়ে তোমাকে আমি বিশেষ উপদেশ দিচ্ছি। সেগুলোর প্রতি লক্ষ্য রেখো।
● নারী, শিশু ও বৃদ্ধদেরকে হত্যা করবে না।
● ফলন্ত বৃক্ষ কেটো না।
● আবাদ ভূমিকে ধ্বংস করো না।
● খাওয়ার উদ্দেশ্যে ভিন্ন বকরী বা উট হত্যা করো না।
● মৌমাছির মৌচাক পোড়ায়ে দিও না অথবা পানিতে ডুবিয়ে দিও না।
● গনিমত বা যুদ্ধলদ্ধ মাল হতে কিছু চুরি করো না।
● হতোদ্যম বা ভীরু হইও না।
(হাদিসটি ইমাম মালিক মুআত্তা মালিক এ হাদিসটি এককভাবে বর্ণনা করেছেন, অধ্যায় জিহাদ)

❖ প্রকৃতপক্ষে ইসলামে উগ্রবাদী, জঙ্গিবাদ ও চরমপন্থার কোনো স্থান নেই। ইসলাম হল দয়া, মমতা ও শান্তির অগ্রদূত।
ইসলামে প্রয়োজনে জিহাদ ও যুদ্ধের কথা রয়েছে। তবে তা অবশ্যই বেশ কিছু অলঙ্ঘনীয় শর্তসাপেক্ষে।

সুতরাং যে অপরাধী চক্র শ্রীলংকায় এই ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা করে শত শত মানুষকে হত্যা করেছে তাদের প্রতি আমাদের ঘৃণা এবং ধিক্কার জানানোর ভাষা নেই। আমরা মনে করি, ইসলামের নাম দিয়ে কেউ এমনটি করে থাকলে প্রকৃতপক্ষে তারা ইসলামের দুশমনদের ক্রীড়নক ও দাবার গুটি এবং তারা তাদের পরিকল্পনা ও অর্থায়নে এই বর্বরোচিত হামলার মাধ্যমে শ্রলংকান মুসলিমদেরকে ধ্বংস করতে চায় এবং বাধাগ্রস্ত করতে চায় বিশ্বব্যাপী ইসলামের উত্থানকে। কিন্তু তাদের জানা উচিৎ, ষড়যন্ত্র করে ইসলামের উত্তাল তরঙ্গমালা থামানো সম্ভব নয়। নিশ্চয় আল্লাহ বড় পরিকল্পনাকারী যদিও দুশমনারা তা উপলব্ধি করতে পারে না।

হে আল্লাহ, তুমি শ্রীলংকান মুসলিমদেরকে হেফাজত করো, ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী কুচক্রী গোষ্ঠিকে পরাভূত করো এবং সারা বিশ্বমানবতাকে দান করো শান্তি ও নিরাপত্তা। নিশ্চয় তুমি পরম কুশলী ও ক্ষমতাবান।
আল্লাহুম্মা আমীন।
▬▬▬✪✪✪▬▬▬
উত্তর প্রদানে: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
(লিসান্স, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যায়লয়, সৌদি আরব)
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।।

Share This Post