কোরআন ও সহীহ সুন্নাহ ভিত্তিক প্রশ্নোত্তর প্রচার করাই হল এই ওয়েবসাইটের মূল উদ্দেশ্য।।

যদি বিনা কারণে কোনও পুরুষের জন্য নারীর চোখে এক ফোটা পানিও পড়ে তবে ফেরেশতাগণ ঐ পুরুষকে তার প্রতি পদক্ষেপে অভিশাপ দেবে এটা কি সত্যি

প্রশ্ন “যদি বিনা কারণে কোনও পুরুষের জন্য নারীর চোখে এক ফোটা পানিও পড়ে তবে ফেরেশতাগণ ঐ পুরুষকে তার প্রতি পদক্ষেপে অভিশাপ দেবে।” এটা কি সত্যি?
উত্তর:
এটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদিস হিসেবে নয় বরং আলি রা. এর উক্তি হিসেবে পরিচিত। তা হল:
عن علي بن أبي طالب رضي الله عنه : ” إذا دمعت عين أنثى بظلم بسبب رجل ، تلعنه الملائكة بكل خطوة يخطوها
কিন্তু মুহাদ্দিসদের দৃষ্টিতে এর কোনও ভিত্তি নেই। কোনও নির্ভরযোগ্য হাদিসের কিতাবে এর অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। হতে পারে এটি শিয়া-রাফেজি সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে তার দিকে সম্বন্ধ কৃত কথা। তারা আলি রা. এর নামে এমন হাজার হাজার বানোয়াট উক্তি ছড়িয়ে দিয়েছে-যেগুলোর আদতে কোনও ভিত্তি নেই।

শাবী [আমের বিন শুরাহবিল। বিশিষ্ট তাবেয়ী ও ফকিহ-জন্ম: ২২, মৃত্যু: ১০০ হিজরি] বলেন,
” مَا كذب عَلَى أحد من هذه الأمة ما كذب عَلَى عَلِيّ ” انتهى من “الكامل” (2/451) .
“এই উম্মতে আলি রা. এর মত আর কারও উপর এত বেশি মিথ্যাচার করা হয় নি।” [আল কামেল ২/৪৫১]

➤ সরাসরি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দিকে সম্বন্ধ করে এমন একটি হাদিস প্রচলিত আছে। কিন্তু সেটিও মিথ্যাচার। তা হল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন (!),

والله لو أغضب زوجٌ زوجتَه وقفَّى عنها راحلا ، تاركا إياها حزينة ، فإن الله يكتب له في كل خطوة لعنة ، ويبعد عنه رزقه ، ويقلل من عافيته ، ويكتب له من كل دمعة من عينيها ألف جمرة في كل ليلة ، نصفها في الدنيا ، والنصف الآخر في الآخرة
“আল্লাহর কসম, যদি কোনও স্বামী তার স্ত্রীকে ক্রোধান্বিত করে তাকে দু:খ ভারাক্রান্ত অবস্থায় পেছনে ফেলে চলে যায় তাহলে আল্লাহ তার প্রতিটি পদক্ষেপে একটি করে লানত (অভিসম্পাত) লিখবেন, তার জীবিকা বিদূরিত করবেন, তার রোগমুক্তি ও নিরাপত্তা কমিয়ে দিবেন এবং তার প্রতি ফোটা অশ্রুর বিনিময়ে তার জন্য প্রতি রাতে এক হাজার জ্বলন্ত আঙ্গার (যা দ্বারা তাকে জাহান্নামের আগুনে পোড়ানো হবে) লিপিবদ্ধ করবেন-অর্ধেক দুনিয়াতে এবং বাকি অর্ধেক আখিরাতে।”

এটি বিদআতি হুজুর আর মাঠ গরম করা সুরেলা বক্তাদের তৈরি করা জাল হাদিস! স্বামীরা যেন তাদের স্ত্রীদের সাথে খারাপ ব্যবহার না করে সে উদ্দেশ্যে তারা এ সব বানোয়াট হাদিস প্রয়োগ ও প্রচার করে! আর সোশ্যাল মিডিয়া তো আবেগী ধর্ম প্রচারকদের কারণে সত্য-মিথ্যা বুঝে উঠাই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এরা এতটা এতটা জাহেল ও গাফেল যে, দীনের বিষয়ে সত্য-মিথ্যা যাচায় করার বিষয়টি যেন তাদের মাথায় নেই। অথচ মিথ্যা হাদিস প্রচার করা জাহান্নামের আগুনে নিজের বাসস্থান নির্ধারণ করে নেয়ার নামান্তর। আল্লাহ আমাদেরকে ক্ষমা করুন। আমিন।

মনে রাখতে হবে, ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর একে অপরের দায়িত্ব-কর্তব্য ও দাম্পত্য জীবনের আদব সম্পর্কে অনেক সুস্পষ্ট বক্তব্য রয়েছে। স্ত্রীর সাথে সদাচরণ করা, তাকে ভালবাসা, সম্মান করা, তার প্রতি কৃতজ্ঞতা আদায় করা, তার হক আদায় করা, তার উপর সাধ্যাতিরিক্তে কোনও দায়িত্ব চাপিয়ে না দেয়া, তার সাথে পরামর্শ করা, তার সাথে আনন্দ-বিনোদন করা, তার অনুভূতিকে মূল্যায়ন করা, হালাল পন্থায় যথাসাধ্য সুন্দরভাবে তার ভরণ-পোষণের সুব্যবস্থা করা ইত্যাদি সম্পর্কে কুরআন ও বিশুদ্ধ হাদিসে পর্যাপ্ত নির্দেশনা রয়েছে। সে সকল হাদিসের প্রতি আমল করলে আমাদের প্রতিটি গৃহকোণ হয়ে উঠবে মধুময় জান্নাতের বাগান।

মোটকথা, ইসলাম নির্দেশিত পন্থায় দাম্পত্য জীবনকে সাজাতে হবে। কোনোভাবেই তার প্রতি জুলুম করা, তার হক নষ্ট করা, তাকে কষ্ট দেয়া, বিনা কারণে কাঁদানো ইত্যাদি জায়েজ নাই। কারও দ্বারা এমনটি ঘটলে আখিরাতে আল্লাহর কাঠগড়ায় তার শাস্তির সম্মুখীন হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে যদি জীবদ্দশায় তার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা না করে বা নিজেদের মাঝে মিটমাট না করে নেয়।

বি. দ্র. দাম্পত্য জীবনে নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রে এ বিষয়গুলো প্রযোজ্য।
আল্লাহু আলাম।

উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

Share This Post