কোরআন ও সহীহ সুন্নাহ ভিত্তিক প্রশ্নোত্তর প্রচার করাই হল এই ওয়েবসাইটের মূল উদ্দেশ্য।।

পিতা-মাতা যদি নিজেদের হীন স্বার্থসিদ্ধি, পরকিয়া ইত্যাদি কারণে সন্তানের প্রতি অবিচার করে

পিতা-মাতা যদি নিজেদের হীন স্বার্থসিদ্ধি, পরকিয়া ইত্যাদি কারণে সন্তানের প্রতি অবিচার করে, তাকে তাদের স্নেহমমতা, মেন্টালী সাপোর্ট ইত্যাদি থেকে বঞ্চিত করে তাহলেও কি সন্তানের জন্য উক্ত পিতামাতার প্রতি সম্মান ও আনুগত্য প্রকাশ করা আবশ্যক? হলে কোন যুক্তিতে?
▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬
প্রশ্ন:
■ ১) ধরুন, কোন পিতামাতা নিজেদের স্বার্থে তাদের সন্তানকে অবহেলা করল- যার কারণে সন্তান তাদের পক্ষ থেকে কোন সাপোর্ট পেলো না (স্পেশালী মেন্টালি)। সুতরাং সে যখন বুঝবান হবে তখন কি তার মা-বাবাকে মানা উচিত? যদি হয় তবে এর কারণ কি?
■ ২. আজকাল বিভিন্ন খবরে আসছে যে, পরকীয়ার দরুন মা বাবা সন্তানকে মেরে ফেলতে চেষ্টা করছে। এক্ষেত্রে সে যদি ঘটনা ক্রমে বেঁচে যায় তাহলে বড় হলে স্বভাবতই তার উক্ত মা-বাবা হতে সম্মান-শ্রদ্ধা-ভক্তি অবশিষ্ট থাকার কথা নয়৷
এ ক্ষেত্রে তার করণীয় কি? তারা যদি তাকে ঠিকভাবে প্রতিপালন না করে তবে তার বাবা-মাকে মানা কতটা জরুরি? কেন জরুরি? কুরআন তো বলেছে বাবা মাকে মানতে হবে। কুরআনের আইন এখানে কোন কারণে বা কোন যুক্তিতে প্রযোজ্য? দয়া করে দলিল সহ দিয়ে উপকৃত করবেন।
▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬

উত্তর:
আল্লাহ তাআলা পিতামাতা এবং সন্তান উভয়কে কতিপয় দায়িত্ব প্রদান করেছেন। তাদের জন্য সেসব দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের চেষ্টা করা ফরজ। এর ব্যাত্যয় ঘটলে আখিরাতে তাদের উভয়কে বিচারেরে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হতে পারে।

◆◆ নিম্নে পিতামাতা ও সন্তানের দায়িত্ব-কর্তব্য, এবং সন্তানের প্রতি অবহেলা প্রদর্শনের পরিণতি সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা হল:

 সন্তানদের প্রতি পিতামাতার দায়িত্ব:
প্রত্যেক পিতামাতার দায়িত্ব হল, তার সন্তানদের প্রতি যথাসাধ্য যত্ন নেয়া, তাদেরকে সঠিকভাবে প্রতিপালন করা, তাদের দ্বীন শিক্ষার ব্যবস্থা করা, তাদের শারীরিক ও মানসিক প্রবৃদ্ধির ব্যাপারে তদারকি করা। সন্তানদের প্রতি এ দায়িত্ববোধ মানব জাতির স্বাভাবিক ও প্রকৃতিগত বিষয়।
তবে বিশেষ করে সন্তানদেরকে দ্বীন শিক্ষায় শিক্ষিত করা এবং তাদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করার উদ্যোগ গ্রহণ করা মুসলিম হিসেবে প্রতিটি পিতামাতার জন্য ফরয।
🔰 আল্লাহ তাআলা বলেন:
আল্লাহ বলেন: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا “হে মুমিনগণ, তোমাদের নিজেদেরকে ও তোমাদের পরিবার-পরিজনদের রক্ষা করো জাহান্নামের আগুন থেকে।” (সূরা তাহরীম: ৬)
কোন পিতামাতা যদি সন্তানদের প্রতি তাদের উপর অর্পিত দায়িত্বে অবহেলা করে তাহলে আল্লাহর কাছে তাদেরকে বিচারের কাঠগড়ায় প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে।
🔰 রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
لاَ كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ،… وَالرَّجُلُ رَاعٍ عَلَى أَهْلِ بَيْتِهِ، وَهُوَ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ، وَالمَرْأَةُ رَاعِيَةٌ عَلَى أَهْلِ بَيْتِ زَوْجِهَا، وَوَلَدِهِ وَهِيَ مَسْئُولَةٌ عَنْهُمْ،… أَلاَ فَكُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ.
জেনে রেখ, তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। পুরুষ তার পরিবারবর্গের বিষয়ে দায়িত্বশীল, তাকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। নারী তার পরিবার, সন্তান-সন্ততির বিষয়ে দায়িত্বশীল, তাকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। জেনে রেখ, তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। (-সহীহ বুখারী, হাদিস ৭১৩)

 পিতামাতার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব:
সন্তান যখন বড় হবে তার উপর আবশ্যক হচ্ছে, পিতামাতাকে তাদের হক প্রদান করা, তাদের সাথে সুন্দর আচরণ করা, তাদেরকে কোনভাবে কষ্ট না দেয়া, তাদের প্রয়োজন পূরণ করা এবং যথাসাধ্য তাদের খেদমত করা-যদিও তারা সন্তানের প্রতি তাদের উপর দায়িত্ব পালনে অবহেলা ও ব্যর্থতার পরিচয় দেয়। এর কারণ হল, পিতার শরীরের একটা বীর্য মাতৃগর্ভে প্রবেশের মাধ্যমে তার অস্তিত্ব সৃষ্টি হয়েছে এবং তাদের দুজনেরে মাধ্যমেই সে দুনিয়ার মুখ দেখতে পেয়েছে। তার মা তাকে অনেক কষ্ট করে গর্ভে ধারণ করেছেন, অবর্ণনীয় প্রসব বেদনা সহ্য করেছেন, তাকে দুধ পান করিয়েছেন। এ জন্য বাবা-মা উভয়কে অবর্ণনীয় কষ্ট শিকার করতে হয়েছে।
তাই পিতামাতার প্রতি কৃতজ্ঞতার প্রমাণ হিসেবে এবং আল্লাহর বিধান বাস্তবায়নের স্বার্থে তাদেরকে তাদের হক প্রদান করতে হবে।
🔰 আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَوَصَّيْنَا الْأِنْسَانَ بِوَالِدَيْهِ حَمَلَتْهُ أُمُّهُ وَهْناً عَلَى وَهْنٍ وَفِصَالُهُ فِي عَامَيْنِ أَنِ اشْكُرْ لِي وَلِوَالِدَيْكَ إِلَيَّ الْمَصِيرُ

“আর আমি তো মানুষকে তার পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছি। তার জননী তাকে (সন্তানকে) কষ্টের পর কষ্ট বরণ করে গর্ভে ধারণ করে এবং তার দুধ ছাড়ানো হয় দুই বছরে। সুতরাং আমার প্রতি ও তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। প্রত্যাবর্তন তো আমারই নিকট।” (সূরা লোকমান: ১৪) এ মর্মে আরও অনেক আয়াত ও হাদীস বিদ্যামান রয়েছে।

 পিতামাতা যদি সন্তানকে স্নেহমমতা থেকে বঞ্চিত করে এবং তাদের প্রতিপালনে অবহেলা প্রদর্শন করে
পিতামাতা যদি ইচ্ছাকৃত ভাবে বিনা ওজরে সন্তানের প্রতি অবহেলা প্রদর্শন করে, তাকে স্নেহমমতা থেকে বঞ্চিত করে এবং তার প্রতি আল্লাহর পক্ষ থেকে অর্পিত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার পরিচয় দেয়, তার প্রতি জুলুম-অত্যাচার করে এবং বেঁচে থাকা অবস্থায় এ অপরাধের কারণে আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা না করে তাহলে আখিরাতে তাদেরকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। কারণ আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক ব্যক্তিকে তাঁর দায়িত্ব সম্পর্কে অবশ্যই জিজ্ঞেস করবেন যেমনটি উপরের হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।
মোটকথা, পিতামাতা যদিও তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার পরিচয় দেয় বা সন্তানের প্রতি অবিচার করে সন্তানের জন্য বড় হয়ে তাদেরকে কষ্ট দেয়া বা তাদের প্রতি প্রতিশোধ মূলক আচরণ করা জায়েয নয়। বরং যথাসম্ভব তাদেরকে তাদের প্রাপ্য (হক) দেয়ার চেষ্টা করতে হবে। আর পিতামাতার অন্যায় আচরণের বিচারের ভার আল্লাহর হাতে ছেড়ে দিতে হবে। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা সবচেয়ে বড় ন্যায় বিচারক।
▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি
Daee, at jubail Dawah and guidance center.KSA

Share This Post