কোরআন ও সহীহ সুন্নাহ ভিত্তিক প্রশ্নোত্তর প্রচার করাই হল এই ওয়েবসাইটের মূল উদ্দেশ্য।।

পানাহার ছাড়া অন্যান্য কাজে এলকোহল ব্যবহার করার বিধান

প্রশ্ন: এলকোহল কি শুধু খাবারের ক্ষেত্রে হারাম? নাকি সর্বক্ষেত্রে? বর্তমানে বিভিন্ন জায়গায় খাবার ছাড়াও বিভিন্ন কাজে এলকোহল ব্যবহার করা হচ্ছে। যেমন, বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কাবাব বানানোর সময় কয়লা জ্বালানোর জন্য এলকোহল ব্যবহার করা হয়। এখন এ ক্ষেত্রে এলকোহল ব্যবহার করে কয়লা জ্বালিয়ে, সেই আগুনে মাংস পুরিয়ে কি খাওয়া যাবে?

এ ছাড়াও ঘর বা দোকান-পাট পরিষ্কার করার জন্য এলকোহল ব্যবহার করা হয়। এছাড়াও বডি স্প্রে বা সুগন্ধিতেও এক ধরণের এলকোহল ব্যবহার করা হয়।
অনেকে বলে থাকেন, এলকোহলের প্রকারভেদ আছে। বডি স্প্রে বা সুগন্ধিতে যে এলকোহল ব্যবহার করা হয় তা ব্যবহার করা যাবে।
এখন মূল প্রশ্ন হচ্ছে, এলকোহলের কি কোন প্রকারভেদ আছে? এবং উপরে যেগুলো ব্যবহারের কথা উল্লেখ করলাম এগুলো কি বৈধ? এভাবে কি ব্যবহার করা যাবে? কেননা, আমি যতটুকু জানি, যে জিনিস হারাম, তার বিন্দুমাত্রও হারাম।

উত্তর:
এলকোহল পানাহারের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হারাম এতে কোন মতভেদ নেই। তবে পানাহার ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে ব্যবহার যেমন আপনি উল্লেখ করেছেন হারাম কি না তাতে ফিকাহবিদদের মধ্যে মতভেদ আছে। এই মতভেদের কারণ হচ্ছে, এলকোহল বস্তুটি মূলত: পাক না নাপাক।

অধিকাংশ বিদ্বান মত প্রকাশ করেছেন যে, তা নাপাক। এই জন্যে তাঁরা তা কোন ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা যাবে না মত প্রকাশ করেছেন। তাঁদের দলীল হচ্ছে, আল্লাহর বাণী:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنْصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
“হে ঈমানদারগণ! নিশ্চয় মদ জুয়া, মুর্তির বেদী এবং শুভ-অশুভ নির্ণয়ের তীর, এসব গর্হিত বিষয়, শয়তানী কাজ। সুতরাং এ থেকে সম্পর্ণ দূরে থাক। তাহলে তোমরা সফকাম হতে পারবে।” (সূরা মায়েদাঃ ৯০)এখানে তাঁরাرِجْسٌ ‘রিজস’ শব্দের অর্থ করেছেন ‘নাপাক’। আর فَاجْتَنِبُوهُ বলে আল্লাহ তা সম্পূর্ণ রূপে বর্জন করতে বলেছেন। তাই তা কোন ধরণের কাজে ব্যবহার করা যাবে না।

কিন্তু আরেক দল মুহাক্কেক বিদ্বান মত প্রকাশ করেছেন যে, মদ বা এলকোহল খাওয়া হারাম, কিন্তু জিনিসটি পাক। অর্থাৎ শরীরে লাগলে ওযু করতে হবে না বা কাপড়ে লাগলে তা ধৌত না করেও সালাত করা যাবে। যেমন বিষ পান করা হারাম, কিন্তু তা শরীরে লাগলে শরীর নাপাক হবে না। তাঁদের দলীল,
 (১) এটা নাপাক হওয়ার সুস্পষ্ট কোন দলীল নেই। কেননা প্রত্যেক বস্তুর মূল হচ্ছে পাক বা পবিত্র। যতক্ষণ নাপাক বলার পক্ষে সুস্পষ্ট দলীল না পাওয়া যাবে, ততক্ষণ তাকে নাপাক বলা যাবে না।
(২) যখন মদ হারাম ঘোষণা করা হয়, তখন সাহাবায়ে কেরাম সুরাহী থেকে মদ মদীনার ওলি-গলিতে ও বাজারে বইয়ে দেন। যদি তা নাপাক হত, তবে নাপাক বস্তু কখনই এভাবে বাজারে বা চলাফেরার রাস্তায় বইয়ে দিতে অনুমতি দেয়া হত না।
(৩) রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাঁদেরকে মদের পাত্র সমূহ ধৌত করতে আদেশ করেননি। যেমনটি খায়বার বিজয়ের দিন গৃহপালিত গাধার গোস্ত হারাম ঘোষণা করে, যে পাতিলে তা রান্না করা হয়েছিল তা ধৌত করতে আদেশ করেছিলেন।
(৪) আল্লাহ যে উদ্দেশ্যে মদ হারাম করেছেন, প্রশ্নে উল্লেখিত ব্যবহার গুলোতে সে উদ্দেশ্য পাওয়া যায় না। আল্লাহ বলেন,
إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَنْ يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاءَ فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَنْ ذِكْرِ اللَّهِ وَعَنِ الصَّلَاةِ فَهَلْ أَنْتُمْ مُنْتَهُونَ
“শয়তান তো এটাই চায় যে, মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের পরস্পরের মধ্যে শত্রুতা ও হিংসা সৃষ্টি করে দিতে এবং আল্লাহর যিকির ও সলাত থেকে তোমাদেরকে বিরত রাখতে, সুতরাং এখনও কি তোমরা নিবৃত্ত হবে না?” (সূরা মায়েদাঃ ৯১)
উল্লেখিত ব্যবহারগুলোতে এই উদ্দেশ্য পাওয়া যায় না, অর্থাৎ এর মাধ্যমে মাদকতাসৃষ্টি হবে না, ফলে শত্রুতাও হবে না এবং সালাত ইত্যাদি থেকে বিরত থাকারও দরকার পড়বে না।
আর ৯০ নং আয়াতে যে ‘রিজস’ শব্দ ব্যবহার হয়েছে তা দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে অর্থগত নাপাকী, বস্তুগত নয়। যেমন আল্লাহ কাফেরদেরকে ‘নাজাস’ বা নাপাক বলেছেন। (সূরা তাওবাঃ ২৮) তার দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে তারা অন্তরের দিক থেকে নাপাক, বাহ্যিক বা শারীরিক দিক থেকে নয়, অর্থাৎ তাদের শরীরের সাথে মুসলমানের শরীর স্পর্শ হলে ওযু নষ্ট হবে না।
والله أعلم
দলীল-প্রমাণের আলোকে ২য় অভিমতটি অধিক শক্তিশালী বলে প্রতিভাত হচ্ছে।
সুতরাং ২য় অভিমত অনুযায়ী, এলকোহল পানাহার ছাড়া অন্যান্য কাজে ব্যবহারে কোন আপত্তি নাই ইনশাআল্লাহ।
পরিশেষে বলব, কেউ যদি বিকল্প বস্তু দ্বারা (পানাহার ছাড়া) তার প্রয়োজন পূরণ করতে পারে তাহলে এলকোহল ব্যবহার থেকে বিরত থাকাই উত্তম (যেহেতূ বিষয়টি মতবিরোধপূর্ণ)। কিন্তু বিকল্প কিছু না থাকলে এলকোহল ব্যবহার করা জায়েয রয়েছে ইনশাআল্লাহ।

উত্তর দিয়েছেন:
শাইখ মুহা. আবদুল্লাহ আল কাফী বিন আব্দুল জলীল
সম্পাদনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
লিসান্স, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, ksa

Share This Post