কোরআন ও সহীহ সুন্নাহ ভিত্তিক প্রশ্নোত্তর প্রচার করাই হল এই ওয়েবসাইটের মূল উদ্দেশ্য।।

পরীক্ষায় নকল করা ও তাতে সহযোগিতা করার বিধান

পরীক্ষায় নকল করা ও তাতে সহযোগিতা করার বিধান:(নকল জাতি ধ্বংসের এক নেপথ্য কারিগর)
▬▬▬◯❖◯▬▬▬
প্রশ্ন: পরীক্ষায় নকল করা এবং নকলে সহযোগিতার বিধান কি? পরীক্ষার হলে কেউ যদি আমাকে কোনও প্রশ্নের উত্তর জিজ্ঞেস করে আমি তখন কী করবো?

▪️উত্তর:

বর্তমানে আমাদের সমাজে নকল একটি ওপেন সিক্রেট বিষয়। আমাদের সমাজ ব্যবস্থা অসততা ও দুর্নীতিতে এতটাই কলুষিত যে, নকলের বিরুদ্ধে কথা বলা যেন একটি প্রগলভতা। নকল যে একটি মহা প্রতারণা তা যেন আমাদের অধিকাংশ শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষা কর্মকর্তা ও প্রশাসনের মাথা থেকে সরে গেছে। যার কারণে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার একদম প্রাথমিক স্তর থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত চলছে নকলের মহোৎসব। এই মহোৎসবে হারিয়ে যাচ্ছে প্রকৃত জ্ঞান চর্চা, সৃজনশীলতা এবং উদ্ভাবনী শক্তি। যার কারণে আমরা একটি নড়বড়ে ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে ক্রমান্বয়ে হয়ে পড়ছি একটি পরনির্ভর এবং নকলবাজ জাতিতে। আল্লাহ আমাদেরকে রক্ষা করুন। আমিন।

যাহোক, এমন একটি হতাশাজনক অবস্থায় নিম্নে ইসলামের দৃষ্টিতে নকল করা এবং তাতে সহযোগিতা করার বিধান সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা হল:

◈◈ পরীক্ষায় নকল করার বিধান:

পরীক্ষায় নকল করা হারাম ও কবিরা গুনাহ। চাই তা অন্য কারো দেখে লেখা হোক বা কারো কাছে শুনে লেখা হোক বা গোপনে দেখে দেখে লেখা হোক অথবা এ ক্ষেত্রে অন্য কোন অসদুপায় উপায় অবলম্বন করা হোক। কেননা, এটা প্রতারণা। আর ইসলামে প্রতারণা করা হারাম ও কবিরা গুনাহ।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
مَنْ حَمَلَ عَلَيْنَا السِّلاَحَ فَلَيْسَ مِنَّا ، وَمَنْ غَشَّنَا فَلَيْسَ مِنَّا -رواه مسلم
“যে ব্যক্তি আমাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়; আর যে ব্যক্তি আমাদের সাথে প্রতারণা করে, সেও আমাদের দলভুক্ত নয়।” (সহিহ মুসলিম)

হাদিস বিশারদগণ বলেছেন, যে কোন কাজে-কর্মে প্রতারণা করা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উক্ত হাদিসের আওতাভুক্ত। পরীক্ষায় প্রতারণার আশ্রয় নেয়ার বিষয়টিও সেগুলোর মধ্যে একটি।

➤ পরীক্ষায় নকলের ব্যাপারে শাইখ বিন বায. রহ. এর ফতোয়া:

তিনি বলেন:

“পরীক্ষায় নকল করা মানুষের সাথে লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রতারণার মতই হারাম ও ন্যাক্কার জনক কাজ। বরং সাধারণ লেনদেনের চেয়ে পরীক্ষায় নকল করা বেশি ভয়ানক হতে পারে। কারণে নকলের মাধ্যমে সে হয়ত বড় বড় চাকুরি লাভ করবে। সুতরাং পড়াশোনার সকল ক্ষেত্রে নকলের আশ্রয় নেয়া হারাম। কারণ সহিহ হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম বলেছেন,
مَنْ غَشَّنَا فَلَيْسَ مِنَّا
“যে ব্যক্তি আমাদের সাথে প্রতারণা করে সে আমাদের দলভুক্ত নয়।”
তাছাড়া এটি একটি খিয়াতন বা বিশ্বাসঘাতকতা। আর আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لا تَخُونُوا اللَّهَ وَالرَّسُولَ وَتَخُونُوا أَمَانَاتِكُمْ وَأَنْتُمْ تَعْلَمُونَ
“হে ঈমানদারগণ, তোমরা জেনে-শুনে খেয়ানত করো না আল্লাহ ও রসূলের সাথে এবং খেয়ানত করো না নিজেদের পারস্পরিক আমানতের ক্ষেত্রে।” (সূরা আনফাল: ২৭)
সুতরাং শিক্ষার্থীদের জন্য আবশ্যক হল, তারা যেন কোন পাঠ্য বিষয়েই নকলের আশ্রয় না নেয় করে বরং তারা যেন প্রস্তুতি নেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর অধ্যবসা ও পরিশ্রম করে যেন তারা বৈধভাবে উত্তীর্ণ হয়।” (শাইখের অফিসিয়াল ওয়েব সাইট)

◈◈ নকলে সহযোগিতার বিধান:

নকল করা যেমন হারাম তেমনি নকলে সহযোগিতা করাও হারাম। ছাত্র-ছাত্রীরা যেমন নকল করলে গুনাহগার হবে তেমনি পরীক্ষা হলে নিয়োজিত গার্ড, শিক্ষক, পরিদর্শক অথবা তৃতীয় কোন পক্ষ যদি নকল করতে সহায়তা করে বা নকলের পরিবেশ সৃষ্টি করে তাহলে তারাও গুনাহগার হবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ ۖ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ ۚ وَاتَّقُوا اللَّـهَ ۖ إِنَّ اللَّـهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ
“সৎকর্ম ও আল্লাহ ভীতিতে একে অন্যের সাহায্য কর। পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে একে অন্যের সহায়তা করো না। আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলা কঠোর শাস্তি দাতা।” (সূরা মায়িদা: ২)

সুতরাং পরীক্ষার হলে কেউ যদি আপনার নিকট উত্তর জানতে চায় বা আপনার খাতা দেখে লিখতে চায় তাহলে তাকে সে সুযোগ দেয়া যাবে না। অন্যথায় অন্যায় কাজে সহায়তার কারণে আপনিও গুনাহগার হবেন। তাছাড়া পরীক্ষায় নকলে সহায়তা করা আইনত: দণ্ডনীয় অপরাধ। [পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) আইন-১৯৮০ অনুযায়ী, পরীক্ষার হলে নকলের সুনির্দিষ্ট শাস্তি রয়েছে।]

◈◈ নকলে সহায়তা একটি জাতি ধ্বংসে সহায়তার নামান্তর:

নকলে সহায়তা শুধু এটি প্রতারণা ও অন্যায় কাজে সহযোগিতা নয় বরং একটি বিশ্বাস ঘাতকতা এবং জাতি ধ্বংসে সহযোগিতার শামিল। কেননা এর ফলে দেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও অবকাঠামোগত ভীত নড়বড়ে হয়ে পড়ে-যা কোন জাতির অধঃপতনের পূর্বশর্ত।
আমরা জানি, আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামীতে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পালন করবে। সুতরাং তারা যদি এখন ভালোভাবে পড়াশোনা না করে এবং ভালোভাবে পরীক্ষার প্রস্তুতি না নেয় বরং নকল করে পাস করার অপেক্ষায় অতিরিক্ত খেলাধুলা, আড্ডাবাজি, রং-তামাশা, মস্তানি, রংবাজি, প্রেম-পরকীয় ও নানা অকাজে-কুকাজে সময় অপচয় করে তাহলে তা জাতির জন্য এক ভয়ঙ্কর পরিণতি ডেকে আনবে। যার দায়ভার নকলকে প্রশ্রয়দানকারী ও সহায়তাকারী ঐ সকল ব্যক্তিবর্গ এড়াতে পারবে না।
দুর্নীতির মাধ্যমে পরীক্ষায় পাশ করা ছাত্র-ছাত্রীরাই যখন ভবিষ্যতে দেশের বিভিন্ন সেক্টরে দায়িত্ব গ্রহণ করবে তখন তারাই অন্যায় ও দুর্নীতির মাধ্যমে এবং যথোপযুক্ত সেবা না দিয়ে দেশ ও দেশের মানুষের বারোটা বাজিয়ে ছাড়বে।

এ সকল প্রতারক ও ভুয়া সার্টিফিকেট ধারী অযোগ্য ব্যক্তিরা দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের সহায়তায় দেশের গুরুত্বপূর্ণ সব বিভাগে রাজত্ব করে আর সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিরা সেখানে অপাংক্তেয় বিবেচিত হয়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশ ও জাতি সবাই। এটি একদিকে মানুষের অধিকার হরণেরও শামিল।

এদের কারণে সমাজে প্রকৃত গুণীরা কদর পায় না। বরং সমাজের সর্বত্র চাটুকার, দুর্নীতিবাজ, তেলবাজ, ধান্ধাবাজ ও প্রতারক চক্রের জয়জয়কার।

এর মূল কারণ হল, এরা পরিশ্রম, অধ্যবসা, কষ্ট-সাধনা, ত্যাগ-তিতিক্ষা, আল্লাহ ভীতি, ঈমান, সততা-সৎচরিত্র ও নীতি-নৈতিকতার উপর গড়ে উঠে নি। বর্তমানে যার কু পরিণতি আমাদের জাতি হাড়ে তাড়ে টের পাচ্ছে। আল্লাহ আমাদেরকে হেফাজত করুন। আমিন।

সুতরাং পরীক্ষার হলে, কেউ যদি আপনার খাতা দেখে লিখতে চায় বা কোন প্রশ্নের উত্তর জানতে চায় তাহলে আপনার জন্য আবশ্যক হল, তাকে সহযোগিতা না করা। কারণ তা প্রতারণায় সহযোগিতার শামিল-যা ইসলামের দৃষ্টিতে হারাম এবং প্রচলিত আইনেও দণ্ডনীয় অপরাধ।

◈◈ নকল প্রবণতার কারণ:

ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে পরীক্ষায় প্রতারণা ও জালিয়াতির অসংখ্য উপায়-উপকরণ প্রচলিত। এর বিভিন্ন কারণ রয়েছে। সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হল, দীনী পরিবেশের অনুপস্থিতি ও ঈমানি দুর্বলতা। ‘মহান আল্লাহ আমাদের গোপন ও প্রকাশ্য সবকিছু দেখছেন ও পর্যবেক্ষণ করছেন’ এই অনুভূতি না থাকার কারণে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, প্রশাসনের কর্মকর্তা, বিচারক, রাষ্ট্রীয় দায়িত্বশীল এবং বিভিন্ন সেক্টরে কর্মরত সরকারি ও বেসরকারি আমলাগণ প্রতিনিয়ত অসংখ্য-অগণিত পদ্ধতিতে দুর্নীতি, প্রতারণা ও জালিয়াতির আশ্রয় নিচ্ছে।

সুতরাং আসুন, একটি উন্নত, সভ্য, সৎ ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনের স্বার্থে আমরা প্রত্যেকেই নকলের বিরুদ্ধে গণ সচেতনতা তৈরি করি, শিক্ষার্থীদেরকে প্রকৃত জ্ঞানচর্চায় উৎসাহিত করি এবং ‘একমাত্র রেজাল্টই যে ভালো মন্দের মাপকাঠি নয়’ সেটা নিজেরা উপলব্ধি করি এবং শিক্ষার্থীদের মাঝে এ দৃষ্টিভঙ্গি ছড়িয়ে দেই। সর্বোপরি ঈমান, আল্লাহ ভীতি, সততা এবং নীতি-নৈতিকতার উপরে আমাদের আগামী প্রজন্মকে গড়ে তুলি। আল্লাহ তাওফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬◄❖►▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

Share This Post