খালি গায়ে বা মহিলাদের মাথা খোলা অবস্থায় কুরআন তিলাওয়াত এবং তিলাওয়াতে সেজদার বিধান

খালি গায়ে বা মহিলাদের মাথা খোলা অবস্থায় কুরআন তিলাওয়াত এবং তিলাওয়াতে সেজদার বিধান। নারী-পুরুষ সবার জন্য যে সব অবস্থায় কুরআন তিলাওয়াত করা সমীচীন নয়:
▬▬▬▬◈◯◈▬▬▬▬
ক. খালি গায়ে বা মহিলাদের মাথা খোলা অবস্থায় কুরআন তিলাওয়াত এবং তেলাওয়াতে সেজদার বিধান:

ইসলামে পূর্ণ শরীর আবৃত করে বা সতর ঢেকে কুরআন তিলাওয়াতের শর্ত না হলেও পাক-পবিত্র অবস্থায় যথাসম্ভব মার্জিত পোশাক-পরিচ্ছদ পরিধান করে সুন্দরভাবে আদবের সাথে বসে কুরআন তিলাওয়াত করা মুস্তাহাব। তাই যখন তিলাওয়াতের ইচ্ছে হবে তখন করণীয় হল, ওজু করার পর পাক-পবিত্র জামা-কাপড় পরিধান করা। অত:পর অন্তরে আল্লাহর কালামের প্রতি সম্মান বজায় রেখে ভয়-ভীতি এবং আন্তরিকতার সাথে আল্লাহর কালাম তিলাওয়াত করতে বসা। এটাই উত্তম।

▪ আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَمَن يُعَظِّمْ شَعَائِرَ اللَّهِ فَإِنَّهَا مِن تَقْوَى الْقُلُوبِ

“আর যে কেউ আল্লাহ্‌র নিদর্শনসমূহকে সম্মান করে সেটি তাহলে নিশ্চয়ই হৃদয়ের তাকওয়া বা আল্লাহ ভীতি থেকে উৎসারিত।” [সূরা হজ: ৩২]

▪ বর্ণিত হয়েছে,

أن مالك بن أنس كان إذا أراد أن يحدث بحديث النبي صلى الله عليه وسلم يلبس أجمل ثيابه، ويتطيب بأحسن ما عنده من طيب، وجلس على أكمل هيئة، وعليه السكينة والوقار

“মালিক বিন আনাস রাহ. যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদিস বর্ণনা করতে বসতেন তখন সবচেয়ে সুন্দর পোশাক পরিধান করতেন, তার নিকটে থাকা সবচেয়ে ভালো সুগন্ধি লাগাতেন এবং ভাব গাম্ভীর্য পূর্ণ অবস্থায় প্রশান্ত চিত্তে পূর্ণ প্রস্তুতি সহকারে বসতেন।”

সুবহানাল্লাহ! আল্লাহর নবীর হাদিসের প্রতি ইমাম মালিক রাহ.-এর এত সম্মান ও আদব পূর্ণ আচরণ থেকে আমাদের জন্য অনেক শিক্ষণীয় রয়েছে।

যাহোক, ব্যস্ততা, অলসতা, ক্লান্তি ইত্যাদি কারণে যদি কখনো খালি গায়ে বা পূর্ণ প্রস্তুতি ছাড়া তিলাওয়াতের ইচ্ছে হয় তাহলে এই অবস্থায়ও কেউ চাইলে কুরআন তেলাওয়াত করতে পারে। শরিয়তে তা নাজায়েজ নয়। বাড়িতে অবস্থান কালে লং, শর্ট, পাতলা, মোটা, ঢিলেঢালা, টাইট-ফিট ইত্যাদি যেকোনো পোশাক পরিধান করে দাঁড়িয়ে, বসে, শুয়ে, হাঁটতে হাঁটতে, কর্মব্যস্ততা ইত্যাদি যে কোনও অবস্থায় কুরআন তেলাওয়াত করা জায়েজ আছে। এতে কোনও গুনাহ নেই ইনশাআল্লাহ। কেননা কুরআন-হাদিসের কোথাও কুরআন তিলাওয়াতের জন্য সতর ঢাকা বা বিশেষ কোনও পোশাক পরিধান করা বা বিশেষ কোন ভঙ্গীতে বসার শর্তারোপ করা হয়নি। তবে নিঃসন্দেহে পূর্ণ আদব রক্ষা করে তিলাওয়াত করতে বসা উত্তম।

অনুরূপভাবে মহিলারাও বাড়িতে স্বামী কিংবা মাহরাম পুরুষদের সামনে কিংবা কেবল মহিলাদের উপস্থিতিতে অথবা একাকী থাকার সময় মাথার চুল খোলা অবস্থায়ও কুরআন তিলাওয়াত করতে পারে। তবে পরপুরুষের উপস্থিতিতে অবশ্যই পূর্ণ পর্দা সহকারে নীরবে তিলাওয়াত করবে।

❑ মহিলাদের মাথার চুল খোলা অবস্থায় কুরআন তিলাওয়াত করা এবং তেলাওয়াতে সেজদা দেওয়ার বিধান প্রসঙ্গে আল্লামা শাইখ আব্দুল্লাহ বিন বায ও আল্লামা শাইখ মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমিন রাহ.-এর ফতোয়া:

◆ শাইখ বিন বায রাহ. কে প্রশ্ন করা হয়, কুরআন তিলাওয়াত বা তিলাওয়াতের সেজদা দেওয়ার সময় কি মহিলাদের হিজাব থাকা আবশ্যক?

তিনি উত্তরে বলেন,

لا يلزمها حجاب، إذا كان ما عندها أجنبي لا، ولو طرحت خمارها عن رأسها تقرأ لا بأس، إذا كان ما عندها أجنبي، وتسجد إذا مرت بسجود تلاوة تسجد، هذا هو الأفضل، وإذا كان مرت بآية سجود كونها تجعل الخمار على رأسها أفضل عند السجود

“না, এ সময় হিজাব থাকা আবশ্যক নয়-যদি তার কাছে কোনও পরপুরুষ না থাকে। যদি তার মাথা থেকে ওড়না সরেও যায় তবুও তিলাওয়াত করতে থাকবে। এতে কোনও সমস্যা নেই যদি তার কাছে কোনও পরপুরুষ না থাকে।
আর যখন সেজদার আয়াত অতিক্রম করবে তখন সেজদা করবে। এটাই উত্তম। আর সেজদার আয়াত আসার ক্ষেত্রে সেজদা দেওয়ার সময় মাথায় ওড়না রাখাটা উত্তম।”

◆ শাইখ উসাইমিন রাহ. বলেন,

قراءة القرآن لا يشترط فيها ستر الرأس

“কুরআন তিলাওয়াতের জন্য মাথা ঢাকা শর্ত নয়।” [ফতোয়া ইবনে উসাইমিন ১/৪২০]

– তিনি তেলাওয়াতে সেজদা প্রসঙ্গে বলেন,

وسجود التلاوة يكون حال قراءتها للقرآن، لا بأس بالسجود على أي حال ولو
مع كشف الرأس ونحوها لأن هذه السجدة ليس لها حكم الصلاة

“তেলাওয়াতে সেজদা দিতে হয় কুরআন তিলাওয়াতরত অবস্থায়। যে কোনও অবস্থায় সেজদা দিতে কোনও সমস্যা নেই যদিও মাথাখোলা বা এ জাতীয় অবস্থায় হয়। কারণ এই সেজদার জন্য সালাতের বিধান প্রযোজ্য নয়।” [আল ফাতাওয়া আল জামেয়াহ লিল মারআলি মুসলিমাহ (মুসলিম মহিলাদের ফতোয়া সমগ্র) ১/২৪৯]

❑ নারী-পুরুষ সবার জন্য যে সব অবস্থায় কুরআন তিলাওয়াত করা সমীচীন নয়:

যে সব অবস্থায় কুরআন তিলাওয়াত করা সমীচীন নয় সেগুলো হল নিম্নরূপ:

◆ ১. স্ত্রী সহবাসে লিপ্ত অবস্থায়।
◆ ২. প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণের সময় (পেশাব-পায়খানা রত অবস্থায়) বা টয়লেটে অবস্থান কালীন।
◆ ৩. পাপাচারে লিপ্ত থাকার সময়।
◆ ৪. স্ত্রী সহবাস, স্বপ্নদোষ বা বীর্যপাতের ফলে শরীর নাপাক থাকা অবস্থায় কুরআন স্পর্শ করা বা তিলাওয়াত করা জায়েজ নয় গোসলের মাধ্যমে পবিত্রতা অর্জন করা পর্যন্ত।
◆ ৫. ওজু বিহীন অবস্থায় (অধিক বিশুদ্ধ মতে) মুসহাফ (লিখিত কুরআন গ্রন্থ) স্পর্শ করা জায়েজ নয়। তবে মুখস্থ তিলাওয়াত করা জায়েজ। অনুরূপভাবে ওজু বিহীন অবস্থায় মোবাইল ডিভাইস থেকে অথবা হ্যান্ড গ্লাভস/কাপড়ের আবরণ বা গিলাফ সহকারে কুরআন ধরা এবং তিলাওয়াত করা যাবে।

◆ ৬. মহিলাদের হায়েজ-নিফাস তথা ঋতুস্রাব ও সন্তান প্রসবোত্তর স্রাব কালীন সময় কুরআন তিলাওয়াত করা জায়েজ কি না সে বিষয়ে আলেমদের মাঝে দ্বিমত দেখা যায়। তবে অধিক সর্তকতা ও দ্বিমত থেকে বাঁচার স্বার্থে এ সময় নফল ইবাদত হিসেবে তিলাওয়াত না করাই ভালো। তবে বিশেষ দরকারে তিলাওয়াত করা যেতে পারে। যেমন: ছাত্রীদের কুরআন পরীক্ষার প্রস্তুতি বা পরীক্ষার জন্য তিলাওয়াত/লিখা, ভুলে যাওয়ার আশঙ্কা, হেফজখানায় শিক্ষকতা ইত্যাদি। তবে এ ক্ষত্রে সরাসরি মুসহাফ (গ্রন্থ কুরআন) স্পর্শ করবে না। তবে হ্যান্ড গ্লাভস, কুরআনের গিলাফ বা কোনও কিছুর আবরণ অথবা মোবাইল/ল্যাপটপ ডিভাইস থেকে বা মুখস্থ তিলাওয়াত করতে পারে। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।