কাফির রাষ্ট্রে পড়াশোনা ও অবস্থানের বিধান

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলার অগণিত প্রশংসা দিয়ে শুরু করছি। একইসাথে আশরাফুল আম্বিয়া, সায়্যিদুল মুরসালিন, খাতামুন নাবিয়্যিন, আবুল ক্বাসিম মুহাম্মাদ বিন ‘আব্দিল্লাহ বিন ‘আব্দিল মুত্তালিব আল-হাশিমী আল-কুরাইশী এর উপর অসংখ্য সালাত ও সালাম কামনা করছি; আল্লাহুম্মা সাল্লি আলাইহি, আল্লাহুম্মা বারিক আলাইহি। সাম্প্রতিক সময়ে আমার পরিচিতদের মাঝে অনেকেরই উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে অমুসলিম দেশে ভ্রমণের প্রবণতা লক্ষ্য করেছি। এবং তাদের সাথে আলাপ করে বুঝলাম তারা অনেকেই এর শরী’ঈ বিধান সম্পর্কে অবগত নয়। তাই এই প্রবন্ধটি সংকলন করতে সচেষ্ট হলাম। আল্লাহর পূর্ণ তাওফীক কাম্য।

বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধে অমুসলিম দেশে ভ্রমণের হুকুম সম্পর্কে যুগশ্রেষ্ঠ তিন কিংবদন্তী আলিমের ফাতওয়া উল্লেখ করা হয়েছে। আশা করি প্রবন্ধটি শেষ পর্যন্ত পড়লে পাঠকের খোরাক মিটবে এবং এ বিষয়ে সংশয় নিরসন হবে, ইন শা আল্লাহ।

১. সৌদি আরবের সাবেক গ্রান্ড মুফতি, সামাহাতুশ শাইখ, আল-‘আল্লামাহ্, ইমাম আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দিল্লাহ বিন বায (رحمه الله)-কে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন,

❝ অমুসলিম দেশগুলিতে ভ্রমণ করা একটি ঝুঁকি যা একান্ত প্রয়োজন ব্যতীত মুসলিমদের এড়িয়ে চলতে হবে। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,

“আমি ঐ সমস্ত মুসলিমদের দায়ভার বহন করবো না যারা মুশরিকদের মাঝে থাকে।” [আবু দাউদ: ২৬৪৫, তিরমিযী: ১৬০৪; সনদ: সহিহ (তাহকিক: আলবানি)]

মুসলিম কর্তৃপক্ষসমূহের (ওয়াফফাক্বাহুমুল্লাহ) উচিত নয় জরুরি প্রয়োজন ছাড়া অমুসলিম দেশে লোক পাঠানো। তবে অমুসলিম দেশের প্রতিনিধিদের হতে হবে পরহেজগার, দ্বীন সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞানী এবং ওসব দেশে ভ্রমনের ফলে নেতিবাচক প্রভাবের আশংকামুক্ত। এছাড়াও তত্ত্বাবধায়কগণের উচিত অবশ্যই তাদের সহযোগিতা করা এবং তাদের সার্বক্ষণিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা। অমুসলিম দেশে দাওয়াতের উদ্দেশ্য প্রতিনিধি পাঠানো জায়েজ, এমনকি উত্তমও বটে, যাতে করে সেখানে ইসলামের প্রচার হয়। উপরিউক্ত দুটি অবস্থা বাদে অন্য কোনো অবস্থাতে যুবকদের অমুসলিম দেশে পাঠানো কদর্যকাজ (মুনকার) হিসেবে বিবেচিত, যাতে চরম ঝুঁকি রয়েছে। একই হুকুম বর্তাবে অমুসলিম দেশে ব্যাবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে। এর কারণ হলো সেখানে ফিতনাহ এবং পাপাচারের প্রচার প্রসার, যেখানে ব্যাক্তির সর্বদা শয়তান, তার কুপ্রবৃত্তি এবং অসৎসঙ্গী হতে সতর্ক থাকা উচিত। ❞[১]

২. যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস, আল-‘আল্লামাহ, ইমামুস সালাফিয়্যাহ, শাইখ মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আল-আলবানী (رحمه الله) কে উক্ত বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি জবাবে বলেন,

❝ আমাদের এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই যে, বর্তমানে কোনো কাফির দেশে মুসলিমদের বসবাস করা জায়েয নয়। কাউকে যদি কোনো মুসলিম দেশ থেকে বের করে দেয়া হয়, তাহলে সে অন্য কোনো মুসলিম দেশে চলে যাবে। ❞ [২]

৩. সামাহাতুল ফাক্বীহ, আল-‘আল্লামাহ্, আশ-শাইখুল ইমাম মুহাম্মাদ ইবনু সালিহ আল-উসাইমীন (رحمه الله) এ বিষয়ে বলেন,

❝ ব্যাক্তিগত এবং বিশেষ কোনো বৈধ প্রয়োজনে সেখানে অবস্থান করা জায়েয, যেমন ব্যাবসা বা চিকিৎসা। তবে তা হতে হবে প্রয়োজন অনুযায়ী, প্রয়োজনের অতিরিক্ত সেখানে অবস্থান করা যাবে না। উলামায়ে কিরাম ব্যাবসার জন্য কাফির রাষ্ট্রে অনুপ্রবেশকে জায়েয বলেছেন এবং এ বিষয়ে দালীল হিসেবে তারা কিছু সংখ্যক সাহাবীর উদ্ধৃতি পেশ করেছেন।

আর পড়াশুনার জন্য কাফির রাষ্ট্রে অবস্থান করা; এ ধরনের অবস্থান যদিও পূর্বোল্লিখিত প্রয়োজনে কাফির রাষ্ট্রে অবস্থানের অন্তর্ভুক্ত, তথাপি অন্যান্য প্রয়োজনে সেখানে অবস্থানের তুলনায় পড়াশোনার জন্য অবস্থানের বিষয়টি তার দ্বীন ও চরিত্রের জন্য অধিকতর ক্ষতিকর ও বিপজ্জনক। কেননা যে কোন শিক্ষার্থী মর্যাদার দিক দিয়ে নিজেকে ছোট মনে করে এবং তার শিক্ষককে বড় মনে করে থাকে। এক্ষেত্রে তাই এমন হবে যে, সে তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে, তাদের চিন্তা-চেতনা, মতাদর্শ এবং চাল-চলনকে সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নিবে এবং এভাবে এক সময় সে তাদেরকে অন্ধভাবে অনুসরণ করতে শুরু করবে। তবে খুব কম সংখ্যক শিক্ষার্থী যাদেরকে আল্লাহ্ হিফাযত করে থাকেন, কেবল তারাই এরূপ পরিস্থিতি থেকে বেঁচে থাকতে পারে।

তাছাড়া একজন শিক্ষার্থী বিভিন্ন প্রয়োজনে তার শিক্ষকের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকে। এতে করে শিক্ষার্থী তার শিক্ষককে ভালবাসতে শুরু করে এবং শিক্ষকের গোমরাহী ও পথভ্রষ্টতাকে সে তোষামোদ করতে থাকে। তাছাড়া ঐসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষার্থীর অনেক কাফির সহপাঠী থাকে এবং তাদের মধ্য থেকে সে অনেককে বন্ধু হিসেবে বেছে নেয়। সে তাদেরকে ভালবাসে, তাদের সাথে বন্ধুত্ব করে ও তাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়। এ প্রকারের বিপদের কারণে পূর্বোল্লেখিত প্রকারের চেয়ে নিজেকে অধিক হেফাযত প্রয়োজন। আর তাই মৌলিক ২টি শর্তের পাশাপাশি আরো কয়েকটি শর্তারোপ করা হয়েছে। সেগুলো হলো:

i. শিক্ষার্থীকে বিবেক-বুদ্ধির দিক দিয়ে যথেষ্ট পরিপক্ক হতে হবে, যা দ্বারা সে কল্যাণকর এবং ক্ষতিকর বিষয় সমূহের মাঝে পার্থক্য নিরূপণ করতে পারবে এবং সুদূর ভবিষ্যতে কী ঘটতে পারে তা দেখতে পাবে। আর কম বয়সী এবং অপরিপক্ক বুদ্ধ-জ্ঞান সম্পন্ন শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার জন্য কাফিরদের দেশে পাঠানোর কাজটি হবে তাদের দ্বীন, চরিত্র এবং চাল-চলনের জন্য খুবই বিপজ্জনক। তাছাড়া এটি তাদের জাতি ও সম্প্রদায়ের জন্যও মারাত্মক বিপজ্জনক। তার এ বিষপান তার ফিরে যাওয়া জনগোষ্ঠীর মধ্যেও সংক্রমিত হবে। বাস্তবতা ও পর্যবেক্ষণও তাই সাক্ষ্য দেয়। কেননা পড়াশোনার জন্য পাঠানো বহু শিক্ষার্থী কাঙ্ক্ষিত বিষয়ের পরিবর্তে অন্য কিছু নিয়েই ফিরে এসেছে। তারা দ্বীন, চরিত্র এবং চাল-চলনে বিপথগামী হয়ে ফিরেছে। আর এসব বিষয়ে তাদের নিজেদের এই সমাজের যে কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তা তো জানা কথা এবং সাক্ষ্যও তাই বলে। কাজেই অপরিপক্ক জ্ঞান-বুদ্ধি সম্পন্ন এসব কম বয়সী শিক্ষার্থীকে পড়াশোনার জন্য কাফির রাষ্ট্রে পাঠানো যেন কোন ভেড়ীকে হিংস্র কুকুরের মুখে তুলে দেওয়ার মতই কাজ।

ii. শিক্ষার্থীর নিকট ইসলামী শারীআতের এই পরিমাণ জ্ঞান থাকতে হবে যা দ্বারা সে হক ও বাতিলের মাঝে সুস্পষ্টভাবে পার্থক্য নিরূপণ করতে পারে এবং সত্য দিয়ে মিথ্যাকে প্রতিহত করতে পারে। যাতে করে কাফিরদের বাতিল বিষয়াদি দ্বারা সে প্রতারিত না হয় এবং বাতিলকে যেন সত্য বলে মনে না করে বা বিভ্রান্তিতে যেন না পড়ে কিংবা বাতিলকে প্রতিহত করতে অক্ষম হয়ে দিশেহারা অথবা বাতিলের অনুসারী না হয়ে যায়। হাদীসে বর্ণিত দুআ’য় রয়েছে

اللهم أرني الحق حقا وارزقني اتباعه وأرني الباطل باطلا وارزقني اجتنابه ولا تجعله ملتبسا علي فأضل

“হে আল্লাহ্! সত্যকে সত্য হিসেবে আমাকে দেখাও এবং তা অনুসরণ করার তাওফীক আমাকে দান করো। আর বাতিলকে বাতিল হিসেবে আমাকে দেখাও এবং তা থেকে বেঁচে থাকার তাওফীক আমাকে দান করো এবং সত্য-মিথ্যার বিষয়টি আমার কাছে অস্পষ্ট রেখো না, তাহলে আমি পথভ্রষ্ট হয়ে যাবো।”

iii. শিক্ষার্থীর মাঝে এ পরিমাণ ধার্মিকতা থাকতে হবে যা তাকে কুফর এবং পাপাচার থেকে রক্ষা করবে। ধার্মিকতার দিক দিয়ে দুর্বল কোন ব্যক্তি কাফির রাষ্ট্রে অবস্থান করে নিরাপদে থাকতে পারে না। তবে হ্যাঁ, আল্লাহ্ নিজ অনুগ্রহে যদি কাউকে নিরাপদে রাখেন তাহলে সেটা ভিন্ন কথা। কেননা সেখানে তাকে আক্রমণকারী বিষয়সমূহ বেশ শক্তিশালী এবং তার প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশ দুর্বল। সেখানে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের কুফর ও পাপাচারের অসংখ্য শক্তিশালী উপকরণ। এগুলো যদি এমন কোন স্থানে সংঘটিত হয় যেখানে প্রতিরোধ ব্যবস্থা বেশ দুর্বল, তাহলে যা হবার তাই হবে।

iv. মুসলিম জাতির জন্য কল্যাণকর যে জ্ঞানার্জন প্রয়োজনীয়তার দাবী, তা অর্জনের মত প্রতিষ্ঠান তার নিজ দেশে নেই। কিন্তু সে বিষয়ে যদি মুসলিম জাতির কোন ফায়দা না থাকে অথবা সে বিষয়ে জ্ঞানার্জনের ব্যবস্থা যদি কোন ইসলামী দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে থাকে, তাহলে সে জ্ঞানার্জনের জন্য অমুসলিম রাষ্ট্রে অবস্থান করা জায়েয নয়। কারণ অমুসলিম দেশে অবস্থান একদিকে যেমন দ্বীন ও আখলাকের জন্য বিপজ্জনক, অন্যদিকে তা প্রচুর অর্থ-সম্পদ অনর্থক অপচয় করার কারণও বটে। ❞ [৩]


পাদটীকা:
[১] https://tinyurl(.)com/binbazstudyabroad
[২] সিলসিলাতুল হুদা ওয়ান নূর, ক্যাসেট নং ৬১৭; বঙ্গানুবাদ: ফাতওয়ায়ে আলবানী, পৃ: ৩৬৬
[৩] শারহু সালাসাতিল উসুল, বঙ্গানুবাদ, আলোকধারা হতে প্রকাশিত, পৃ: ২৮৯


অনুবাদ ও সংকলন: মুহাম্মাদ আখলাকুজ্জামান।
সম্পাদনা: মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ মৃধা।