কোরআন ও সহীহ সুন্নাহ ভিত্তিক প্রশ্নোত্তর প্রচার করাই হল এই ওয়েবসাইটের মূল উদ্দেশ্য।।

অপছন্দনীয় স্বামীর সাথে বিয়ে হলে করণীয়

প্রশ্ন: কোনও মেয়েকে যদি তার অপছন্দের মানুষের সাথে বিয়ে দেওয়া হয় তাহলে কি সে নিজেকে এ সান্ত্বনা দিতে পারে যে, পরিবারের দিকে তাকিয়ে ইহকালটা এই স্বামীর সাথে কোনও রকম ভাবে কাটিয়ে দি। কিন্তু পরকালে (যদি জান্নাতি হই) আমি আমার পছন্দের কারোর সাথে থাকবো। এমন সুযোগ কি আছে?
উত্তর:
ইসলামের দৃষ্টিতে প্রাপ্ত বয়স্ক নারীর বিয়ের পূর্বে তার সম্মতি নেওয়া অপরিহার্য। তার সম্মতি ব্যতিরেকে জোরপূর্বক বিবাহ দেওয়া বৈধ নয়।

আবু সালামাহ রা. হতে বর্ণিত, আবু হুরায়রা রা. তাদের কাছে বর্ণনা করেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
لاَ تُنْكَحُ الأَيِّمُ حَتّٰى تُسْتَأْمَرَ وَلاَ تُنْكَحُ الْبِكْرُ حَتّٰى تُسْتَأْذَنَ قَالُوا يَا رَسُوْلَ اللهِ وَكَيْفَ إِذْنُهَا قَالَ أَنْ تَسْكُتَ.
“বিধবা/স্বামী পরিত্যক্তা নারীকে তার সম্মতি ব্যতীত বিয়ে দেয়া যাবে না এবং কুমারী নারীকে তার অনুমতি ছাড়া বিয়ে দেয়া যাবে না।”
লোকেরা জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল, কেমন করে তার অনুমতি নেয়া হবে?
তিনি বললেন, “তার চুপ থাকাটাই হচ্ছে তার অনুমতি।”
[৬৯৭০; মুসলিম ১৬/৮, হাঃ ১৪১৯, আহমাদ ৯৬১১] (আধুনিক প্রকাশনী- ৪৭৫৭, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৪৭৬০)

এ সম্পর্কে ইমাম মুসলিম হাদিস বর্ণনা করেছেন- পূর্বে বিবাহ হয়েছিল এমন মহিলা তার নিজের বিয়েতে মত জানানোর ব্যাপারে তাদের অবিভাবক অপেক্ষাও বেশি অধিকার রাখে। আর অবিবাহিত মেয়েদের নিকট তাদের পিতা বিয়ের মত জানতে চাইলে তাদের চুপ থাকাই তাদের অনুমতি জ্ঞাপক।

সুতরাং অবিভাবকের জন্য আবশ্যক হচ্ছে, বিয়ের পূর্বে অবশ্যই প্রাপ্ত বয়স্ক মেয়ে, বোন প্রমূখ যার বিয়ে দিতে চায় তার সাথে কথা বলবে, তার ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে মূল্যায়ন করবে, তার আগ্রহ-অনাগ্রহকে আমলে নিয়ে তারপর বিয়ের সিদ্ধান্ত নিবে। যদি তার সম্মতি থাকে তাহলে বিয়ে দিবে; অন্যথায় এ ক্ষেত্রে অগ্রসর হবে না। এটাই ইসলামের বিধান। এ বিধান লঙ্ঘণ করা কোনও অবিভাকের জন্য বৈধ নয়। এর পরিণতি খুবই খারাপ। এমন জোর-জবরদস্তি বা কনের অনুমতিহীন বিয়েতে দাম্পত্য জীবন চরম বিশৃঙ্খল এবং হুমকির সম্মুখীন হয়।

অথচ এ বিধান টি আমাদের সমাজে অনেক ক্ষেত্রে অবহেলিত। (আল্লাহ ক্ষমা করুন)

❑ নারীর অসম্মতিতে জোর পূর্বক বিয়ে দেয়া শরিয়ত সম্মত নয়: এমনটি ঘটলে করণীয় কি?

উপরোক্ত হাদিসের উপর ভিত্তি করে ইমাম আবু হানীফা রহ. বলেছেন, অবিভাবক বিবাহিত ও অবিবাহিত মেয়েকে কোন নির্দিষ্ট পুরুষের সাথে বিয়েতে বাধ্য করতে পারে না। অতএব বিধবা কিংবা স্বামী পরিত্যক্তা মহিলাদের কাছ থেকে বিয়ের জন্য রীতিমত আদেশ পেতে হবে এবং প্রাপ্তবয়স্ক অবিবাহিত মেয়ের কাছ থেকে যথারীতি অনুমতি নিতে হবে।

কোন অভিভাবক যদি জোরপূর্বক কোন নারীকে বিয়েতে বাধ্য করে তাহলে ওই নারীর জন্য উক্ত স্বামীর সাথে ঘর সংসার অব্যাহত রাখা অথবা বিবাহবিচ্ছেদ উভয়টিরই অধিকার রয়েছে।

সুতরাং এ অবস্থায় উক্ত মহিলা যদি তার স্বামীর সংসার করতে অনাগ্রহী হয় বা স্বামীকে মেনে নিতে না পারে তাহলে তার জন্য খোলা তালাক এর মাধ্যমে বিয়ে ভঙ্গ করা বৈধ। এক্ষেত্রে সে স্বামীর নিকট অনুরোধ করবে তাকে তালাক দেওয়ার জন্য। এতে স্বামী অসম্মত হলে কোর্টের আশ্রয় নিবে। কোট যথারীতি আইনানুগ ভাবে তাদের মাঝে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটাবে।

❑ পরিস্থিতি ও সামাজিকতার কারণে যদি উক্ত স্বামীকে মেনে নিয়ে ঘর-সংসার করা:

যদি সে মহিলা তার পিতামাতার সম্মান, সামাজিকতা, পারিপার্শ্বিকতা ইত্যাদি দিক বিবেচনা করে উক্ত স্বামীকে মেনে নিয়ে জীবন কাটাতে পারে তাহলে তাতে কোনও সমস্যা নাই। তবে শর্ত হল, স্বামীকে নামাজ-রোজা ও দীন পালনকারী, সু চরিত্রবান এবং জৈবিক চাহিদা পূরণে সক্ষম হতে হবে। এ বিষয়গুলো ঠিক থাকলে তার সাথে সংসার অব্যাহত রাখা জায়েজ আছে। নিজের মন মত না হলেও এ ক্ষেত্রে ধৈর্যের পরিচয় দিলে আশা করা যায়, এতেই তার কল্যাণ রয়েছে।

আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَعَسَىٰ أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ ۖ وَعَسَىٰ أَن تُحِبُّوا شَيْئًا وَهُوَ شَرٌّ لَّكُمْ
“তোমাদের কাছে হয়তো কোন একটা বিষয় পছন্দসই নয়, অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আর হয়তোবা কোন একটি বিষয় তোমাদের কাছে পছন্দনীয় অথচ তোমাদের জন্যে অকল্যাণকর। বস্তুত: আল্লাহই জানেন, তোমরা জান না।” [সূরা বাকারা: ২১৬]

হতে পারে, আল্লাহ চাইলে সময়ের ব্যাবধানে স্বামীর প্রতি ভালবাসা ও আকর্ষণবোধ সৃষ্টি হয়ে যাবে।

মনে রাখতে হবে, দুনিয়ায় মানুষের সব চাহিদা ও আশা-আকঙ্খা পূরণ হওয়া সম্ভব নয়। কারণ কোনও মানুষই পরিপূর্ণ নয়। স্বামী-স্ত্রী কেউ নয়। সবার মাঝেই ত্রুটি-বিচ্যুতি রয়েছে। দোষে-গুণেই মানুষ। তবে মনের সকল চাহিদা পূরণ হবে একটি মাত্র স্থানে। তা হল জান্নাত। দুনিয়ায় তা সম্ভব নয়। (আল্লাহ আমাদেরকে জান্নাতি হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন)

❑ স্বামী যদি দীন বিমুখ ও বেনামাজি ও অসৎ চরিত্রের হয়:

স্বামী যদি দীন বিমুখ, বেনামাজি, চরিত্রহীন বা শারীরিক ভাবে জৈবিক চাহিদা পূরণে অক্ষম হয় তাহলে স্ত্রীর নিজের দীন ও চরিত্র ক্ষতির মুখে পড়ার বা পাপাচারে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সে কারণে এমন স্বামীর সাথে ঘর-সংসার করা জায়েজ নাই।
স্বামী যদি দীনদার হয় কিন্তু চারিত্রিক ক্ষেত্রে অধঃপতিত হয় তাহলে স্ত্রী তাকে নসিহত করবে এবং সংশোধনের সুযোগ দিবে। অনুরূপভাবে শারীরিকভাবে অক্ষম হলে তাকে চিকিৎসার সুযোগ দিবে। কিন্তু সুযোগ দেয়ার পরও চারিত্রিক ভাবে সংশোধিত না হলে বা শারীরিকভাবে উপযুক্ত না হলে এমন স্বামী থেকে ডিভোর্স নেয়া বৈধ।

❑ স্বামীর আনুগত করা এবং তার হক আদায় করা ফরজ:

পছন্দ নয় এমন স্বামীর সাথে সংসার অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে অবশ্যই স্বামীকে তার প্রাপ্য হক প্রদান করতে হবে। অর্থাৎ বৈধ কাজে তার আনুগত্য করা, তাকে সঙ্গ দেয়া, তার অনুপস্থিতিতে তার ঘরবাড়ি সংরক্ষণ ও সন্তান প্রতিপালন করা ইত্যাদি ক্ষেত্রে কোনরূপ অবহেলা প্রদর্শন করা বৈধ নয়।
❑ জান্নাতে কারও মনের চাহিদা অপূর্ণ থাকবে না:
পরকালে জান্নাতে কোনও মানুষের ইচ্ছা অপূর্ণ রাখবেন না। বরং মহান আল্লাহ সেখানে মানুষের সকল চাহিদা ও প্রত্যাশা পূরণ করবেন। আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন,
وَفِيهَا مَا تَشْتَهِيهِ الْأَنفُسُ وَتَلَذُّ الْأَعْيُنُ ۖ وَأَنتُمْ فِيهَا خَالِدُونَ‏ وَتِلْكَ الْجَنَّةُ الَّتِي أُورِثْتُمُوهَا بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ
“আর সেখানে (জান্নাতে) রয়েছে তোমাদের কাঙ্ক্ষিত এবং চোখ জুড়ানো সব কিছু। তোমরা তথায় চিরকাল অবস্থান করবে। এই যে, জান্নাতের উত্তরাধিকারী তোমরা হয়েছ, এটা তোমাদের কর্মের ফল।” [সূরা যুখরুফ: ৭১ ও ৭২]

❑ জান্নাতি হওয়ার জন্য শর্ত পূরণ করা আবশ্যক:

জান্নাতে প্রবেশের জন্য নারী-পুরুষ সকলেই তার শর্তাবলী পূরণ করতে হবে। আর তা হল, ঈমানের পাশাপাশি আল্লাহর ও তার রাসূলের বিধান অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা।
কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিশেষভাবে নারীদের জন্য জান্নাতে যাওয়াকে সহজ করেছেন এবং এ জন্য তাদেরকে মৌলিক চারটি কাজের নির্দেশনা দিয়েছে। তারা সে আলোকে তাদের জীবন পরিচালনা করলে ইনশাআল্লাহ তারা জান্নাতবাসী হবেন।
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

إِذَا صَلَّتِ المَرْأةُ خَمْسَها وَصَامَتْ شَهْرَها وَحَصَّنَتْ فَرْجَها وأطاعَتْ زَوْجَهَا قِيلَ لَها أدْخُلِي الجَنَّة مِنْ أيِّ أبْوابِ الجَنَّةِ شِئْتِ

১. মহিলা যখন পাঁচ ওয়াক্তের সালাত আদায় করে,
২. তার রমযান মাসের সিয়াম পালন করে,
৩. (অবৈধ যৌনাচার থেকে) তার যৌনাঙ্গকে সংযত রাখে,
৪. এবং তার স্বামীর কথা ও আদেশ মত চলে
তখন তাকে বলা হবে, জান্নাতের যে দরজা দিয়ে ইচ্ছা তুমি জান্নাতে প্রবেশ কর।” [হাদিস সম্ভার অধ্যায়: ২৪/ বিবাহ ও দাম্পত্য, পরিচ্ছেদ: স্ত্রী নির্বাচন]

এ ছাড়াও যে সকল কাজ তার উপর ফরজ হবে (যেমন: যদি হজ্জ ফরজ হয় তাহলে তা পালন করবে, যাকাত ফরজ হলে তা আদায় করবে ইত্যাদি) সেগুলো পালন করবে এবং হারাম কার্যাবলী থেকে বিরত থাকবে। তাহলে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং মহান আল্লাহ সেখানে তার মনের সকল চাহিদা ও প্রত্যাশা পূরণ করবেন ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ তাওফিক দান করুন। আমিন।
আল্লাহু আলাম।
– আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

Share This Post